মুহাম্মাদ বিন ক্বাসিম: নাসিম হিজাযী: পার্ট-১

Spread the love

মুহাম্মাদ বিন ক্বাসিম:

  হিন্দুস্তানের পশ্চিম উপকূলীয় গুরুত্বপূর্ণ বন্দরসমূহ ও বর্তমান শ্রীলংকার সাথে আরব ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক ছিল ৷ পৃথিবীতে ইসলাম আসার পূর্বে মূর্খতার যুগেই কিছু সংখ্যক আরব ব্যবসায়ী শ্রীলংকায় এসে বসতি গড়ে তোলে ৷ ইতিমধ্যে আরব বিশ্বে এক নতুন ধর্মের আবির্ভাব ঘটে ৷ তবে এ ধর্ম আরব ব্যবসায়ীদেরকে পৈত্রিক ধর্ম বিশ্বাস পরিত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করেনি ৷ কিন্তু ইরান ও রোমানদের বিরুদ্ধে আরব মুসলমানদের মর্যাদাপূর্ণ ঐতিহাসিক বিজয়বার্তা তাদের হৃদয়ে নতুন করে স্বদেশী জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলে ৷ তৎকালীন যুগে সভ্যতার বিবেচনায় আরবের তুলনায় ইরানকে সভ্য দেশ হিসাবে গণ্য করা হত ৷ আর তাই তুলনামূলকভাবে হিন্দুস্তানের বাজারগুলোতে ইরানী পণ্যের চাহিদাই ছিল বেশি ৷ তাছাড়া হিন্দুস্তানের শাসকগোষ্ঠী ইরানকে শক্তিধর প্রতাপশালী এক দুর্দান্ত প্রতিবেশী হিসাবে জানতো ৷ তাই ইরানী ব্যবসায়ীরা আরব ব্যবসায়ীদের তুলনায় অধিক সুবিধা ও সম্মান পেতো ৷ শক্তিশালী রোমানদের সাথে সিরিয়ার প্রাচীন বন্ধুত্ব থাকায় সিরিয়া থেকে কোন কাফেলা এলে ভীত হিন্দুস্তানিরা তাদেরকে আরবদের থেকে বেশি সমাদর করতো ৷ কিন্তু হযরত আবু বকর সিদ্দীক ও ওমর ফারুক রা: এর গৌরবান্বিত বিজয়ধারা আরবদের মর্যাদা সম্পর্কে প্রতিবেশী জাতিদের মনে ব্যাপক পরিবর্তন আনে ৷
আরবদের অভ্যন্তরীণ বিপ্লব সম্পর্কে অজ্ঞ শ্রীলংকা ও হিন্দুস্তানে বসবাসকারী আরব ব্যবসায়ীরা কুফরের বিরুদ্ধে ইসলামের বিজয়কে ইরান ও রোমানদের বিরুদ্ধে আরবদের বিজয় মনে করে ভীষণ খুশি হত ৷ ফলে আরবদের নতুন ধর্মের প্রতি তাদের বিদ্বেষ ধীরে ধীরে ভালবাসায় রূপ নিতে শুরু করে ৷ এ সময় যারা আরবে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে তারা ইসলামের সুমহান আলোয় আলোকিত হয়ে ফিরেছে ৷
শ্রীলংকায় আরব ব্যবসায়ীদের প্রধান দায়িত্বে ছিলেন আব্দুস শামস্ ৷ এ দ্বীপে তার পূর্ব পুরুষেরা বহুদিন ধরেই বসবাস করে আসছে ৷ এ দ্বীপেই তার জন্ম ৷ তিনি বিয়ে করেছেন এখানে বসবাসরত আরব বংশীয় এক রমণীকে ৷ বাল্যকাল থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত তার সমূদ্র যাত্রা শুধুমাত্র শ্রীলংকা ও কাঠিয়াওয়ারের মাঝে সীমিত থাকায় তিনি জানতেনও না, আরবে তার নিজ বংশীয় আত্মীয়-স্বজন কে কে আছে? তারা কোথায় আছে ?
তবে যখন ইয়ারমুক ও কাদিসিয়ার মুসলমানদের আকস্মিক বিজয়ধ্বনী পৃথিবীজুড়ে ধ্বনিত হতে লাগলো, তখন অন্যান্য আরবদের ন্যায় তিনিও নিজ মাতৃভূমির সাথে আত্মিক সম্পর্ক গড়তে অধিক আগ্রহী হয়ে ওঠেন ৷ আরব মুসলমানদের বিজয়বার্তাগুলো শ্রীলংকার বর্তমান রাজার পিতাকে এক অজানা-অচেনা ব্যবসায়ীর প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে উৎসাহিত করে তোলে ৷ তিনি আব্দুস শামস্ ও তার সঙ্গিদেরকে রাজ দরবারে আমন্ত্রণ জানিয়ে মূল্যবান উপহার দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করেনল ৷ ৪৫ হিজরি সনে পিতার মৃত্যুর পর নতুন রাজা সিংহাসনে উপবেশন করেই আব্দুস শামসকে রাজ দরবারে নিমন্ত্রণ করে বললেন, বহুদিন হল আপনাদের দেশ থেকে কোন ব্যবসায়ী এখানে আসেনি ৷ আমি আরব দেশের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাই ৷ আপনাদের নতুন ধর্মের প্রতি রয়েছে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধাবোধ ও বিস্তারিত জানার গভীর স্পৃহা ৷ আপনি যদি নিজ দেশে যেতে ইচ্ছুক হন, তাহলে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণে আমি প্রস্তুত আছি ৷
উত্তরে আব্দুস শামস্ বললেন, আপনার মুখে আমার হৃদয়ের লুকোনো বাসনাই প্রকাশীত হয়েছে ৷ হ্যাঁ, আমি যেতে অধীর আগ্রহী ৷ আব্দুস শামসের সাথে যাওয়ার জন্য মাত্র পাঁচজন ব্যতিত অবশিষ্ট সকল আরব ব্যবসায়ীরা তৈরি হল ৷
দশদিন পর:
 নৌবন্দরে একটি জাহাজ যাত্রার জন্য প্রস্তুত হল ৷ আরব ব্যবসায়ীদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ আত্মীয়-স্বজনদের থেকে বিদায় নিচ্ছে ৷ বহুদিন আগেই আব্দুস শামসের স্ত্রী পরলোকগমন করেছে ৷ কষ্টগাঁথা বুকে তিনি তার একমাত্র মেয়েকে বিদায় জানান ৷
আব্দুস শামসের মেয়ের নাম সালমা ৷ সারা শহরজুড়ে তার অপরূপ সৌন্দর্যের স্বীকৃতি ছড়িয়ে ছিল ৷ যে কোন অবাধ্য ঘোড়াকে তার অনায়েসে দাবড়িয়ে চলা দেখে আশ্চর্যান্বিত হত দক্ষ ঘোড়সওয়ারগণ ৷ ভয়ংকর ঢেউয়ের মাঝে উচ্ছল পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং উত্তাল সমুদ্রে মাছের মত সাঁতার কাটা দেখে হতাবাক হয়ে যেত শহরের সেরা সাঁতারুরা ৷
আব্দুস শামসের যাত্রার বিশদিন পর: কাঠিয়াওয়ারের ব্যবসায়ীদের একটি জাহাজ বন্দরে নোঙর ফেলে ৷ আব্দুস শামস্ দু‘জন সঙ্গিসহ জাহাজ থেকে নেমে এসে দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে জানালেন, তাদের জাহাজ দূর্ঘটনার স্বীকার হয়ে অন্যান্য সঙ্গিসহ সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে গেছে ৷ কাঠিয়াওয়ারের এ জাহাজটি সময়মত না পৌঁছালে উত্তাল ঢেউয়ের সাথে কিছুক্ষণ লড়াই করে তারাও হারিয়ে যেত ভয়ংকর সমুদ্রের গভীর জলে ৷
এ দুঃসংবাদ শোনে রাজা ভীষন মর্মাহত হন ৷ তিনজন আরবের প্রাণ রক্ষার প্রতিদানে সিন্ধী ব্যবসায়ীদের প্রধান দিলিপ সিংকে রাজ দরবারে ডেকে এনে তিনটি হাতি উপহার দেন ৷ রাজার উদারতায় মুগ্ধ হয়ে দিলিপ সিং ও তার সঙ্গিরা স্থায়ীভাবে লংকায় বসবাসের মনোভাব ব্যক্ত করল ৷ রাজা আনন্দ চিত্তে তাদের আবেদন গ্রহণ করলেন এবং রাষ্ট্রীয় খরচে তাদের জন্য ঘর-বাড়ি তৈরি করে দিলেন ৷
কয়েক বছর পর দিলিপ সিংয়ের বিশ্বস্ততা ও পারদর্শিতায় বিমুগ্ধ হয়ে পুরষ্কার সরূপ রাজা তাকে নৌবাহিনীর প্রধান হিসাবে নিয়োগ দান করেন ৷
এ ঘটনার তিন বছর পর: আবুল হাসান নামে একজন মুসলমান ব্যবসা ও ইসলাম ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে শ্রীলংকায় আগমন করেন ৷ বিরতিহীন কয়েক সপ্তাহ সমুদ্র ভ্রমণের পর একদিন সকালে আবুল হাসান ও তার সঙ্গিরা জাহাজে দাঁড়িয়ে লংকার উপকূলীয় অঞ্চলের শস্য-শ্যামল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিমুগ্ধ নয়নে উপভোগ করছিলেন ৷ তাদের জাহাজকে অভ্যর্থনা জানাতে বন্দরের কিছু নারী-পুরুষ ও বালক-বালিকা নৌকায় চড়ে কেউবা সাঁতার কেটে তাদের দিকে আসছিল ৷ আবুল হাসানের দৃষ্টি থমকে যায় একটি নৌকায় গিয়ে ৷ যেখানে এ দ্বীপের স্বল্প কাপড়াবৃত শ্যাম বর্ণের নারীদের মাঝে রয়েছে এক ব্যতিক্রমী নারী ৷ তার গায়ের রং ফর্সা ৷ মুখাবয়ব ও গঠন এ দ্বীপের অন্যান্য বাসিন্দাদের থেকে একেবারেই ভিন্নরকম ৷ অন্যান্য নৌকার আগে জাহাজের কাছে পৌঁছার জন্য দাঁড় টানায় ব্যস্ত বলিষ্ঠ দুই মাল্লাকে মেয়েটি ভীষণ তাড়া দিচ্ছিল ৷ সব নৌকার আগে জাহাজের কাছে পৌঁছেও যায় ৷ জাহাজের পাটাতনে দাঁড়ানো আবুল হাসানের দিকে মেয়েটি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ৷ কিন্তু আবুল হাসান মেয়েটির নির্বাক চাহনী উপেক্ষা করে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় ৷ আবুল হাসানের সঙ্গিরাও অর্ধনগ্ন পরিধেয়ের একটি মেয়েকে তাদের জাহাজের দিকে আসতে দেখে কুন্ঠাবোধ করছিলেন ৷ যাত্রীদের এমন উপেক্ষা মেয়েটির মনকে বিষিয়ে তোলে ৷ প্রচণ্ড রেগে লংকান ভাষায় সে কি যেন বলল ৷ জাহাজীরা যদিও সে ভাষা সম্পর্কে জ্ঞানহীন তবে মেয়েটির ক্ষোভের ছাপ স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল ৷ কেউ কোন উত্তর দিল না ৷
  হঠাৎ এক নারী কন্ঠে আর্তচিৎকার ভেসে ওঠলো ৷ আবুল হাসান নীচের দিকে তাকিয়ে দেখলেন জাহাজ থেকে আট দশ গজ দূরে সেই সুন্দরী মেয়েটি পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে ৷ নৌকারোহীরা তার চিৎকার শোনেও নির্বিকার হয়ে রইল ৷ তার সাহায্যে কেউ এগিয়ে না এসে সবাই দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে ৷ আবুল হাসান তাকে বাঁচাতে প্রথমে একটি দড়ির তৈরি কৃত্রিম সিঁড়ি তার দিকে নিক্ষেপ করলেন ৷ কিন্তু যখন তিনি বুঝতে পারলেন মেয়েটির হাত পা নিস্তেজ হয়ে যাওয়ায় সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছা তার পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব নয়, তখন তিনি পরিহিত বস্ত্রসহ সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন ৷ কিন্তু মেয়েটি হঠাৎ পানির তলদেশে অদৃশ্য হয়ে গেল ৷ তিনি চিন্তিত চোখে এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলেন ৷ এতক্ষণে জাহাজের আশেপাশে অনেক নৌকা জড় হয়ে গিয়েছে এবং কৌতুহলী দ্বীপবাসী এ দৃশ্য দেখে উচ্চস্বরে হাসছিল ৷ আবুল হাসান তিনবার ডুব দেওয়ার পর তাকে খুঁজে না পেয়ে নিরাশ হয়ে যখন দড়ির সিঁড়ি ধরে জাহাজে ওঠতে যাচ্ছিলেন ৷ তখন তার এক সঙ্গি জাহাজ থেকে উচ্চ আওয়াজে ডেকে বলল, ঐতো সে ওদিকে জাহাজের ওপাশে ৷ সে ডুবে যাচ্ছে, মনে হয় কোন সামুদ্রিক মাছ তাকে ধরে রেখেছে ৷ একথা শোনে স্থানীয় সবাই আবার উচ্চস্বরে হেসে ওঠল ৷ মেয়েটি জাহাজের অপর প্রান্তে গেল কী করে, আবুল হাসানের কিছুতেই বুঝে আসছিল না ৷ দুশ্চিন্তায় আশঙ্কায় পড়ে যান তিনি ৷ পুনরায় ডুব দিলেন ও জাহাজের তলদেশ হয়ে অপর প্রান্তে পৌঁছলেন ৷ কিন্তু সেখানেও খুঁজে পেলেন না তাকে ৷ ওপর থেকে তার সেই সঙ্গি বলছিল, সে ডুবে গেছে ৷ হয়ত মাছ তাকে গিলে ফেলেছে ৷ ব্যর্থ হয়ে নিরাশার সাথে আবুল হাসান জাহাজের অপর প্রান্তে ফিরে এলেন ৷ এবার তার সঙ্গিরাও অন্য সবার হাসির সাথে তাল মিলালো ৷ এক আরব তাকে বলল, আপনি ওঠে আসুন সে আপনার থেকেও ভাল সাঁতারু ৷ আবুল হাসান লজ্জিত মনে ক্লান্ত শরীরে জাহাজে ওঠার জন্য সিঁড়িতে হাত রাখলেন ৷ এক পা তোলতেই আচানক কে যেন তার পা ধরে টেনে আবার পানিতে ফেলে দিল ৷ হতবাক হয়ে তিনি এদিক ওদিক তাকাতেই দেখলেন সেই মেয়েটি সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত ওপরে ওঠছে ৷ আবুল হাসান জাহাজে ওঠে দেখেন তার সঙ্গিরা দুশ্চিন্ত মনে মেয়েটির হাসি শোনছে ৷ আবুল হাসানকে দেখে মেয়েটি বলল, আমার জন্য আপনাকে ভিজতে হল ৷ অনাকাঙ্খিত এই ঘটনার জন্য সত্যিই আমি দুঃখিত ৷ মেয়েটির মুখে আরবী ভাষা শোনে জাহাজের সবাই হতবাক হয়ে গেল ৷
আবুল হাসান তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আরব ?
একদিকে মাথা হেলিয়ে দু‘হাতে চুল নিংড়িয়ে পানি ঝরাতে ঝরাতে মেয়েটি জবাব দিল, হুঁ, আমি আরব ৷ আমরা বহুদিন ধরেই একটি আরব জাহাজের অপেক্ষায় ছিলাম ৷ অভিনন্দন আপনাদেরকে ৷ কি পণ্য এনেছেন আপনারা ?
আরব বংশীয় এক তরুণীকে এমন নির্লজ্জ পোশাকে দেখে আবুল হাসান ও তার সঙ্গিরা ভীষণ কুন্ঠাবোধ করছিল ৷ অস্থির হয়ে তারা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল ৷
কৃত প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে মেয়েটি আবার জিজ্ঞেস করল, আপনারা কি পণ্য এনেছেন তা জানতে চেয়েছিলাম ৷ এত কি ভাবছেন? আরব মেয়েরা কি সাঁতার জানে না? এত অবাক হওয়ার কি আছে? আচ্ছা, আমি নিজেই দেখে নিচ্ছি বলেই মেয়েটি সামনে যেতে চাইল ৷
ধমকের স্বরে আবুল হাসান তাকে বললেন, দাঁড়াও ! আমরা ঘোড়া নিয়ে এসেছি ৷ কিন্তু আমি অাশ্চর্যবোধ করছি এটা ভেবে, এ দ্বীপের আরবরা এখনও অন্ধকার যুগের আরবদের থেকে নিকৃষ্ট জীবন যাপন করছে ৷ মানবিক সভ্য পোশাক পরিধান করা ও পুরুষদের সামনে নারীদের লজ্জার বিষয়টি কেউ এদেরকে এখনও শিক্ষা দেয়নি ৷
রাগে ক্ষোভে মেয়েটি চেহারা লাল করে বলল, কেন? এ পোশাকে কী সমস্যা? এটা কী মানুষের পোশাক নয় ?
হতেই পারে না ৷ মনে হচ্ছে তোমাদের ঘরে ইসলামের কিঞ্চিত আলোও পৌঁছেনি ৷ এই বলে আবুল হাসান একটি জুব্বা বের করে মেয়েটির কাঁধে দিয়ে বললেন, যাও, এখন তুমি চাইলে আমাদের পুরো জাহাজটাই ঘুরে দেখতে পারো ৷
  আবুল হাসানের কথার চেয়ে তার ব্যক্তিত্বের প্রতি অধিক মুগ্ধ হয়ে মেয়েটি নির্দ্বিধায় জুব্বা দিয়ে শরীরের অনাবৃত অংশগুলো ঢেকে নিলো ৷ আবুল হাসানের সর্বমোট পূঁজি ছিল পঞ্চাশটি আরবী ঘোড়া ৷ সে একেক করে সবক‘টি ঘোড়া দেখে একটি সাদা ঘোড়ার পিঠে হাত রেখে বলল- আমি এই ঘোড়াটি কিনতে চাই ৷ কত দিতে হবে?
 আবুল হাসান বললেন- তোমার মাঝে দেখছি আরবদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এখনও বিদ্যমান আছে । এগুলোর মধ্যে এ ঘোড়াটিই সর্বোৎকৃষ্ট । কিন্তু তুমি এর উচিৎ মূল্য দিতে পারবে না । তাছাড়া এ ঘোড়াটি মেয়েদের চড়ার উপযোগিও নয় । এটি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনই অবাধ্য ও দ্রুতগামী ।
 মেয়েটি মৃদু হেসে বলল- তাই নাকী?  আচ্ছা দেখা যাবে । আপনি জাহাজ এত দূরে রেখেছেন কেন?
 আমি প্রথমে এ দেশের রাজার কাছ থেকে অনুমতি নেওয়াটা যথার্থ মনে করছি ।
 এ দেশের রাজা বহুদিন ধরে একটি আরব জাহাজের আগমনের জন্য অধীর আপেক্ষায় ছিলেন । আপনি জাহাজ তীরে নিয়ে চলুন । ঐ যে দেখুন আপনাদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য সেনাপতি নিজেই চলে এসেছেন ।
  দিলিপ সিং আব্দুস শামসের সাথে সুসম্পর্কের সুত্রে আরবী ভাষা অনেকটাই আয়ত্ত করে নিয়েছিল । জাহাজে ওঠেই সে আরবীতে বলল- আপনি জাহাজ এত দূরে রেখেছেন কেন?
 তিনি ভেবেছিলেন, জাহাজ তীরে ভিড়ানোর পূর্বে মহারাজার অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন । আবুল হাসানের পরিবর্তে মেয়েটি উত্তর দিল- দিলিপ সিং বলল, আপনাকে দেখে মহারাজ ভীষন খুশি হবেন । আমি যাচ্ছি । তবে মনে থাকে যেন ঐ সাদা ঘোড়াটি আমার, আমি এর সর্বোচ্ছ মূল্য দিব । একথা বলে মেয়েটি জুব্বা খুলে এক আরবের কাঁধে নিক্ষেপ করে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ল ।
  আব্দুস শামস্ আরবদের জাহাজ আগমনের সংবাদটি আগেই জানতে পেরেছিলেন । শহরের কিছু নামিদামি লোকসহ তিনি আবুল হাসান ও তার সঙ্গিদেরকে অভ্যর্থনা জানান । নিজের ঘরে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেন । তাদের ঘোড়াগুলোকে নিজের অাস্তাবলে রাখেন । অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পঞ্চাশটি ঘোড়া ক্রয় করার জন্য প্রায় দুই শতাধিক ক্রেতার ভীড় জমে গেল । তারা প্রত্যেকেই একে অপরের তুলনায় চড়া মূল্য পেশ করতে লাগল ।
 দিলিপ সিং পরামর্শ দিল- আমার মনে হয় মহারাজকে দেখানোর আগে কোন ঘোড়া বিক্রি করা ঠিক হবে না । তিনিই হয়ত সবক’টি ঘোড়া কিনে নিবেন ।
দিলিপ সিংয়ের মত্কে আব্দুস শামস্ও সমর্থন করলেন । তাদের আলোচনা চলছিল, এর মধ্যেই রাজার দূত এসে জানাল- মহারাজ আরব বণিকদের সাথে সাক্ষাৎ করতে ও তাদের ঘোড়াগুলোকে দেখতে চেয়েছেন । দিলিপ সিং রাজ দূতকে বলল- তুমি গিয়ে মহারাজকে বলো আমরা এখনই আসছি । এ কথা বলে সে আবুল হাসানকে বলল- যে ঘোড়াটি আব্দুস শামসের মেয়ে পছন্দ করেছে সেটা এখানে রেখে যাওয়াই ভাল হবে ৷
 আবুল হাসান বললেন- যদি জনাব তার নিজের জন্য ঘোড়াটি চাইতেন আমি কোন আপত্তি করতাম না । কিন্তু ওটা মেয়েদের চড়ার জন্য মোটেই উপযোগী নয় । ঘোড়াটি খুব অশান্ত ও অবাধ্য । ওটাকে বশে আনা খুবই কঠিন । এক পাশ থেকে আওয়াজ আসলো- না আব্বাজান, আসলে তিনি ভাবছেন আমরা ওটার যথার্থ মূল্য দিতে পারব না ।
 আবুল হাসান দেখলেন জাহাজের সেই মেয়েটি এক হাতে চাবুক অন্য হাতে লাগাম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । কিন্তু তখন তার পোশাক ছিল এক আরবী মেয়ের মতই । অনেকটা নরম স্বরে আবুল হাসান বললেন- আমার কথায় বিশ্বাস না হলে পরীক্ষা করে দেখে নাও, যদি তুমি ওটার মুখে শুধু লাগামটুকুও লাগাতে পারো তাহলে ঘোড়াটি তোমাকে পুরস্কার স্বরূপ দিয়ে দিব ।
 মেয়েটি যেন এই অনুমতিরই অপেক্ষায় ছিল । দেরি না করে আস্তাবলের দিকে সে দ্রুত পায়ে অগ্রসর হল । উপস্থিত লোকজনেরাও তার পিছু পিছু চলল । সবক’টি ঘোড়ার দিকে চোখ বুলিয়ে মেয়েটি তার কাঙ্ক্ষিত সাদা ঘোড়াটির দিকে এগিয়ে গেল । তাকে দেখা মাত্র ঘোড়াটি সাবধান হল । ঘোড়াটির পিঠে আলতো করে হাত ছুঁয়াতেই পিছনের পায়ে ভর করে দাঁড়িয়েগেল । তা দেখে অন্যান্য ঘোড়াগুলো ছুটাছুটি শুরু করল ।
থামো! অনেকটা ধমকের স্বরে বললেন আবুল হাসান এবং সামনে এগিয়ে ঘোড়াটির দড়ি খুলে বাহিরে এনে একটি গাছের সাথে বেঁধে বললেন- যাও এবার তোমার সাহসের পরীক্ষা দাও । মেয়েটি তরিৎ গতিতে অগ্রসর হয়ে আচমকা এক হাতে ঘোড়াটির নীচের চোয়াল শক্ত করে ধরে ফেলল । অন্য হাতে আহত বাঘের মত ক্রুদ্ধ ও আস্ফালনকারী ঘোড়াটির মুখে লাগাম পরিয়ে দিল ।
  উপস্থিত দর্শকদের বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি । এরই মধ্যে মেয়েটি ঘোড়ার বাধন খুলে এক লাফে তার পিঠে চড়ে বসল । ঘোড়াটি কয়েকবার সামনের পায়ে ভর করে পিছনের পা ছুড়তে লাগল । অবশেষে বশে এসে বিদ্যুত বেগে বাড়ির সীমানা অতিক্রম করে বের হয়ে গেল । আব্দুস শামস্ অত্যন্ত গর্বিত চিত্তে বললেন- আরব বিশ্বে এখনও এমন ঘোড়ার জন্ম হয়নি যার পিঠে সালমা চড়তে পারবে না । আফসোস, বাজিতে হেরে গেলেন আপনি । তবে চিন্তার কোন কারণ নেই । ঘোড়ার পূর্ণ মূল্যই আপনি পাবেন ।
 ওটাতো বাজি ছিল না । পুরস্কার ছিল । পুরস্কারের কোন মূল্য নেওয়া যায় না । সৌভাগ্য সে ঘোড়ার যে এমন আরোহী পেয়েছে ।
  না দেখেই সবক’টি ঘোড়া কিনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রাজা । তাই বিনিময়ে শাহী কোষাগার থেকে প্রতিটি ঘোড়ার যে পরিমান মূল্য দেওয়া হল, আরব বণিকদের প্রত্যাশার চেয়ে তা বহু গুণ বেশি ছিল । আরবদের নতুন ধর্ম ও তাদের বিস্ময়কর বিজয়গুলো সম্পর্কে রাজা আবুল হাসানের কাছে অনেক প্রশ্ন করলেন । এ সময় দিলিপ সিং দোভাষীর দায়িত্ব পালন করছিল । রাজার প্রতিটি প্রশ্নে আবুল হাসান সন্তোষজনক উত্তর দিলেন । আলোচনা করলেন ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে । পরিশেষে রাজা ইসলামের বহুমুখী সৌন্দর্যের স্বীকৃতি দেন । আলোচনা শেষে পুনরায় সাক্ষাতের প্রতিশ্রুতি নিয়ে তিনি আবুল হাসানকে বিদায় জানান ।
 আব্দুস শামসের ঘরে ফিরে এসে আবুল হাসান জানতে পেলেন, সালমা ঘোড়া নিয়ে সেই যে বের হয়েছিল এখনও ফিরেনি । আব্দুস শামস্ তার খুঁজে বেরিয়েছেন । যোহরের নামায আদায়ের পর আবুল হাসান চিন্তিত মনে বাড়ির আঙ্গিনায় পায়চারী করছিলেন । সাদা ঘোড়াটি তখন খালি পিঠে দৌড়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল । লাগামটুকুও ছিল না ঘোড়াটির মুখে ৷ আবুল হাসান তার সঙ্গিদের দিকে তাকিয়ে উৎকণ্ঠার সাথে বললেন- আল্লাহ্ জানেন তার ভাগ্যে কি ঘটেছে । ঘোড়াটি অবাধ্য হলেও ভূপতিত আরোহীকে ফেলে চলে আসার কুশিক্ষা তাকে দেওয়া হয়নি । লাগামটি পায়ের নিচে পড়ে ছিঁড়ে যেতে পারে কিন্তু একেবারে খুলে পড়ে যাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয় । আমি এখনই যাচ্ছি ।
আব্দুস শামসের খাদেমের কাছ থেকে আরেকটি লাগাম নিয়ে তিনি ঘোড়াটিকে পরিয়ে দিয়ে ঘোড়াতে চড়ে বেরিয়ে পড়লেন ।
  তিনি ঘোড়াটিকে তার নিজ ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিলেন । ঘোড়াটির চলার গতি দেখে সহজেই বুঝা যাচ্ছিল তাকে কি পরিমাণ খাটানো হয়েছে । গহীন অরণ্যের মাঝ দিয়ে কয়েক মাইল চলার পর এক টিলার ওপরে ওঠে একটি জলপ্রপাতের সামনে ঘোড়াটি থামল । ওপরে যাবার আর কোন পথ নেই । কিছুক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে আবুল হাসান ঘোড়া থেকে নেমে গেলেন । একটি গাছের সাথে ঘোড়াকে বেঁধে রেখে- সালমা, সালমা, বলে ডাকতে লাগলেন । বেশ কিছুক্ষণ এভাবে উচ্চস্বরে ডাকাডাকি ও খোঁজাখুঁজির পর তিনি ক্লান্ত হয়ে জলপ্রপাতের কাছে একটি পাথরের ওপর বসলেন । সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল । আসরের নামায আদায় করে আবুল হাসান এক দুর্গম-সরু পাহাড়ী পথ ধরে খানিকটা এগিয়ে গেলেন । সেখানে পাহাড়ী নদী এক জলপ্রপাতের রূপ নিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল । হঠাৎ নদীর তীরে গাছের ছায়াতলে ঘুমিয়ে থাকা এক তরুণীর দিকে তার চোখ পড়ল । ভাল করে তাকাতেই তিনি সালমাকে চিনতে পারলেন । গাছের ছায়ার মাটির বিছানায় গভীর ঘুমে বিভোর সে । তিনি আরো দেখলেন প্রায় তিন চার গজ লম্বা, মানুষের উরুর মত মোটা একটি বিষাক্ত অজগর সাপ ঘাসের ওপর মাথা তোলে সালমার কাছে পৌঁছতে চেষ্টা করছে । সালমা, সালমা বলে চিৎকার করে তিনি দৌড়ে তার কাছে গিয়ে হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিলেন । মৃদু চিৎকারে চোখ খুলল সালমা । এমন সহজ শিকার হাতছাড়া হওয়ায় উত্তেজিত অজগরটি রাগে-ক্ষোভে ফনা তোলে গর্জন করতে লাগল । আবুল হাসান তার তরবারি কোষমুক্ত করলেন ৷ অজগরটিকে দংশনের প্রস্তুতি নিতে দেখে তিনি দেরি না করে তরবারির এক আঘাতে ওটার দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দিলেন । নদীর স্বচ্ছ পানিতে রক্তাক্ত তরবারি ধুতে ধুতে আবুল হাসান বললেন- তুমি এত বোকা কেন বলতো? এমন জায়গায় কেউ ঘুমায়?
 আকস্মিক এ ঘটনায় সালমা তখনও কাঁদছিল । সে বলল- আমি ক্লান্ত হয়ে এখানে একটু বসেছিলাম । কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি আমি নিজেই জানিনা । এ জায়গাটা আমার অনেক প্রিয় । আমি এখানে প্রায়ই আসি । কিন্তু এমন ভয়ংকর সাপ এর আগে কখনও চোখে পড়েনি । ভাগ্যিস আপনি সময়মত এসেছিলেন । না হয় এতক্ষণে সাপের পেটে থাকতে হত । এবার বলুন আপনি এখানে এলেন কি করে?
  আমি এখানে কিভাবে এসেছি তা তুমি ভাল করেই জানো । তার আগে তুমি বল,  এখানে এসে ঘোড়াটিকে ছেড়ে দিয়েছিলে কেন?
  ওমা! আমি ওটাকে কখন ছাড়লাম? ও নিজেই তো আমাকে একা ফেলে রেখে পালিয়েছে । দুষ্টু হাসি হেসে উত্তর দিল সালমা ।
 সালমার কথায় মিথ্যার ছাপ স্পষ্ট ছিল । আবু হাসান তা বুঝতে পেরে কিছুটা রাগের স্বরে বললেন-
  মনে হচ্ছে অত্যন্ত নীচু পরিবেশে তুমি প্রতিপালিত হয়েছ । তোমার চরিত্রে মূর্খতার যুগের আরবদের ছায়া রয়েছে । তবে তাদের হাজারও দোষের ভীড়েও একটা গুণ বিদ্যমান ছিল, তারা অতিথীদের সাথে কখনোই মিথ্যা বলত না । তোমাকে ফেলে রেখে ঘোড়াটি পালিয়েছে এটা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করিনা । আমার আস্তাবলে রেখে ওকে উত্তমরূপে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে । ঘোড়াটি অশান্ত-অবাধ্য হতে পারে কিন্তু সে আরোহীর সাথে কিছুতেই প্রতারণা করতে পারেনা । এই কুশিক্ষা তাকে দেওয়া হয়নি । সত্তি করে বলতো তুমি নিজে ওর লাগাম খুলে দাওনি, ওকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দাওনি?
 মাথা নীচু করে সালমা বলল- আপনি যেহ্তু অপছন্দ করেন, তাই ওয়াদা করছি আর কখনো মিথ্যা বলব না । কখনোই না ।
  শুধু মিথ্যা বলা নয়, তোমার মাঝে এমন আরও অনেক দোষ আছে যা আমি অপছন্দ করি । শুধু আমি কেন, প্রত্যেক মুসলমানই তা অপছন্দ করবে ।
  আপনি বললে আমি নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে পারি । সব বদ্ অভ্যাস ছেড়ে দিতে পারি । অতিথীকে সন্তুষ্ট করা আমার একান্ত কর্তব্য । তাছাড়া আজকে তো আপনি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন ৷
  আমাকে সন্তুষ্ট করার কোন প্রয়োজন নেই । আমি চাই, মহান আল্লাহ্ যেন তোমার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান । সে জন্য তোমাকে আল্লাহর পছন্দনীয় কাজগুলো করতে হবে এবং তাঁর অপছন্দনীয় বিষয়গুলো পরিত্যাগ করতে হবে । মনে রেখো, অর্ধনগ্ন পোশাকে নারীরা পুরুষের সামনে আসাকে আল্লাহ অপছন্দ করেন ।
  পুরোনো সেই পোশাকগুলো আমি এখন আর পরিধান করি না । আপনি বলার পর থেকেই আমি তা বদলে ফেলেছি ।
  শুধু পোশাক বদলালেই হবে না । তোমার ধ্যান-ধারনা, চিন্তা-চেতনা ও মন-মানসিকতার মাঝেও সম্পূর্ণ পরিবর্তন আনতে হবে । যাক, এখন কথা বলার সময় নেই, সন্ধ্যা হয়ে আসছে । তোমার আব্বাজান তোমাকে নিয়ে খুবই দুঃশ্চিন্তায় আছেন । তিনি তো ঘোড়াটি ফিরে যাওয়ার আগে থেকেই তোমাকে খুঁজতে বেরিয়ে গেছেন ।
  জ্যোৎস্না রাতে রূপালী চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় তারা দু’জন অরণ্যপথ অতিক্রম করছিল । পথে সালমা আবুল হাসানকে তার বংশ, সামুদ্রিক ভ্রমণ ও সঙ্গিদের সম্পর্কে একের পর এক প্রশ্ন করছিল । কিন্তু এইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে আবুল হাসানের মোটেই ভাল লাগছিল না । তার চেহারায় বিরক্তির চিহ্ন ফুটে ওঠেছিল । আবুল হাসানের নিস্পৃহা ও উদাসিনতায় অনেকটা বিব্রত ও লজ্জিত হল সালমা । নিজেকে সামলে নিয়ে বলল-
  দুঃখিত, আজ আমার জন্য আপনাকে অনেক কষ্ট করতে হল । দয়া করে আমাকে ক্ষমা করুন । না হয় শাস্তি দিন । তবুও রাগ করে থাকবেন না । অপরাধী আমি । তাই আমাকেই হেঁটে যাওয়া উচিত । অথচ আমি দিব্যি ঘোড়ায় চড়ে বসে আছি । অনুগ্রহ করে ঘোড়ায় ওঠুন, আমি নেমে যাচ্ছি ।
এবারও আবুল হাসান তাকে হতাশ করে কঠোর ভাষায় বললেন-
  দেখো, তুমি এক অবলা নারী । যে কোন মুহূর্তে তুমি কোন হিংস্র প্রাণীর শিকার হতে পারো । এই ভয়ের কারণেই আমি তোমার সাথে যাচ্ছি । আর না হয় এমন নির্জনে কিছুতেই তোমার সাথে এভাবে পথ চলতাম না ।
  ঐ বৃহদাকার সাপটি যদি আমাকে খেয়ে ফেলতো, তাহলে আপনি কি কষ্ট পেতেন?
  শুধু তোমার বেলায় নয়, আমার সামনে অন্য যে কাউকে এভাবে মেরে ফেললে আমি তেমনই কষ্ট পেতাম ।
  আপনি আমার জন্য নিজেকে কেন বিপদে ফেলতে গেলেন?
  একজন মুসলমান হিসাবে এটা আমার কর্তব্য ছিল ।
সালমা বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল । হঠাৎ দূর থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ ভেসে এল । আবুল হাসান বললেন- দেখ তিনি এখনো তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন । কিছুক্ষণ পর আব্দুস শামস্ সদলবলে তাদের কাছে পৌঁছে গেলেন । মেয়েকে বিপদমুক্ত দেখে তিনি চিন্তামুক্ত হলেন । ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শোনার প্রয়োজন বোধ করলেন না । পরে সালমার মুখে সব শোনে তিনি আবুল হাসানকে কৃতজ্ঞতা জানান ।
   পরদিন সুবহে সাদিকের সময় । পৃথিবী এখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি । আব্দুস শামস্ নিজ বাড়ির ছাদে তন্দ্রাবস্থায় শুয়ে আছেন । তার কানে আযানের সুমধুর সুর ভেসে অাসছিল । কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে চোখ খোললেন তিনি ৷ সালমা তখনো ঘুমাচ্ছিল । আব্দুস শামস্ তাকে জাগিয়ে দিয়ে ভোরের অনাবিল হাওয়া উপভোগের জন্য নিচে নেমে গেলেন । ভোরের শিশির ভেজা ঘাসের ওপর চাদর বিছিয়ে বিশেষ ভঙ্গিমায় দাঁড়ানো ছিল আবুল হাসান ও তার সঙ্গিরা । সবার অাগে রয়েছেন অাবুল হাসান । অন্য সবাই সারিবদ্ধভাবে তার পিছনে । তিনি সুমধুর কণ্ঠে সুরা ফাতিহা ও অারো কিছু অায়াত পাঠ করলেন । কুরঅানের সুমিষ্ট ধ্বনি অাব্দুস শামসের মনে দোলা দিয়ে গেল । প্রতিবেশী কয়েকজন অারবও তার পাশে এসে দাঁড়াল । স্বজাতীয় যুবকদের নতুন পদ্ধতির ইবাদাত তারা একমনে দেখছিল । এক অজানা অাকর্ষণ অনুভব করেন অাব্দুস শামস্ ।  এ অাকর্ষণ এড়ানো যায় না । তাদের রুকু সিজদার  দৃশ্য দেখে তার মনে এক অাত্মভোলা ভাবের সৃষ্টি হয় । বিনয়ের সাথে তিনি নামাযীদের দিকে এগিয়ে যান । কাছাকাছি গিয়ে একবার থমকে দাঁড়ান । পরক্ষণেই আবেগ নিবারনে ব্যর্থ হয়ে নামাযীদের কাতারে দাঁড়িয়ে গেলেন । প্রতিবেশী আরবরাও তার অনুসরণ করল । নামায শেষে আবুল হাসান  তাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন । অাব্দুস শামসের গলা বেয়ে পড়ছিল আনন্দাশ্রু । আবুল হাসান ও তার সঙ্গিরা তাকে অভিনন্দন জানাল ।
অনুরোধের স্বরে আব্দুস শামস্ বললেন- আপনার ভাষায় আশ্চর্য এক যাদু ছিল, দয়া করে আমাকে আরও কিছু শোনান ।
   এগুলো আমার ভাষা নয়, মহান আল্লাহর বাণী ।
   এগুলো মানুষের কথা হতেই পারে না, আমাকে আরও কিছু শোনান ।
আবুল হাসান তার এক সাথি তালহার দিকে ইশারা করলেন । তালহা পবিত্র কুরঅানের হাফেজ ছিল । তালহা সূরা ইয়াছিন তিলাওয়াত করে শোনাল । কুরঅানের পবিত্র বাণী ও তালহার সুমধুর সুর আব্দুস শামস্ ও তার সাথিদের হৃদয় বিগলিত করে তোলল । তিলাওয়াত শেষে আবুল হাসান হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনীসহ ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করলেন এবং তাদের সবাইকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আসার আহ্বান জানালেন ।
   বহুদিন থেকেই আব্দুস শামস্ ও তার সঙ্গিরা আরবদের মর্যাদাপূর্ণ গৌরবময় বীরত্বগাঁথা শোনে শোনে মুহাম্মদ (সা.) এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের স্বীকৃতি মনে প্রাণে দিয়ে আসছিল । আবুল হাসানের আলোচনার পর ইসলামের সত্যতা নিয়ে তাদের মনে আর কোন প্রকার সন্দেহ রইল না । এক সাথে সবাই কালিমা পাঠ করে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিল । ইসলাম গ্রহণের পর আব্দুস শামস্ ‘আব্দুল্লাহ’ নামটি নিজের জন্য পছন্দ করলেন ।
  সালমা একটু দূরের নারকেল গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আঁধার থেকে আলোর পথে আসা যাত্রীদের এ ঘটনা দেখছিল । লজ্জা ও সংকোচে এগিয়ে গিয়ে পিতাকে বলল- আব্বাজান মেয়েরাও কি মুসলমান হতে পারে?
আব্দুল্লাহ মুচকি হেসে আবুল হাসানের দিকে তাকালেন । আবুল হাসান বললেন আল্লাহ মহান ।  তাঁর দয়া নারী-পুরুষ সবার জন্যই সমান ।
  তাহলে আমার নামটিও পরিবর্তন করে দিন । আমিও মুসলমান হতে চাই ।
  নাম বদলানোর প্রয়োজন নেই । তোমার এ নামটিও ইসলামী নাম । তুমি শুধু কালিমা পড়ে নাও ।
সালমা কালিমা পড়ে মুসলমান হল । সবাই দু’ হাত তোলে আল্লাহর কাছে তার জন্য দোয়া করল ।
   আকাশজুড়ে কালো মেঘের ছায়া । হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল । দ্রুততার সাথে সবাই একটি ঘরে প্রবেশ করল । কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি থেমে গেলে দিলিপ সিং সংবাদ নিয়ে এল- মহারাজ আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন ।
সঙ্গিদের ওখানে রেখে আবুল হাসান দিলিপ সিংয়ের সাথে বের হলেন ।
   তপ্ত দুপুরে আবুল হাসান রাজ দরবার থেকে ফিরে এসে সঙ্গিদেরকে জানালেন- রাজা আরো কিছু ঘোড়া কেনার আশা ব্যক্ত করেছেন । তাই তিন-চার দিনের মধ্যেই আরবের উদ্দেশ্যে আমাদেরকে সমুদ্রে জাহাজ ভাসাতে হবে ।
আব্দুল্লাহ তাদেরকে আরো কিছুদিন থেকে যাবার অনুরোধ জানালেন । আবুল হাসান বললেন- মাফ করবেন । আমাদেরকে যেতেই হবে । তবে কথা দিচ্ছি, অতি শিঘ্রই আমরা ফিরে আসব ।
অনুরোধের স্বরে আব্দুল্লাহ আবার বললেন- ইসলাম সম্পর্কে এখনো আমাদের অনেক কিছু অজানা রয়েছে । আপনি যদি তালহাকে রেখে যেতেন খুব ভাল হত ৷
আবুল হাসান তালহার দিকে তাকিয়ে বললেন- সে যদি থাকতে রাজি হয় তাহলে আমি সানন্দে তাকে রেখে যেতে প্রস্তুত ।
   পরদিন আবুল হাসানের সঙ্গিরা জাহাজের পাল মেরামত ও পনাহারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয়ের জন্য বেরিয়ে পড়ল । আবুল হাসান, দিলিপ সিং ও আব্দুল্লাহর পরামর্শে নিজের সম্পূর্ণ পূঁজির বিনিয়োগে আটটি হাতি ক্রয় করলেন এবং নারকেল দ্বারা জাহাজের অবশিষ্ট জায়গা পূরণ করে নিলেন ।
  গোধূলি লগ্নে আবুল হাসান আব্দুল্লাহর বাগানে পায়চারী করছিলেন । হঠাৎ কারো পায়ের আওয়াজ শোনে পিছনে তাকিয়ে দেখলেন সালমা দাঁড়িয়ে আছে । দু’দিন আগেও যে ছিল চঞ্চলা প্রজাপতির মত, মুখে সর্বদা শোভা পেত খুশির ঝিলিক আজ কি এক অজানা বেদনায় সেই সুন্দর মুখ বিষাদে মলিন দেখাচ্ছে ।  মায়াবী সেই দুটি চোখ যা আঁধার রাতের উজ্জ্বল তারকার চেয়েও দীপ্তিময় ছিল, তা আজ অশ্রুভেজা টলমল ।
  সালমা, তুমি এখানে কি করছ? কিছুটা রুক্ষ কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন তিনি, আবুল হাসানের উদাসিনতা সালমাকে হতাশ করল । তার কণ্ঠে বিন্দুমাত্র আন্তরিকতাবোধ না দেখে নিজেকে সামলানোর শত চেষ্টা সত্ত্বেও তার দু’চোখ বেয়ে অশ্রুর ফোঁটা গলিয়ে পড়ল ।
  বিষণ্ন কণ্ঠে সে বলল- আপনি নাকি পরশু চলে যাচ্ছেন?
  হুঁ, কিন্তু তোমার কি হয়েছে বলতো, তুমি এভাবে কাঁদছ কেন?
  কিছু না এমনিতেই ।
সালমার অশ্রুজল চোখ, বিষাদে মলিন মুখ আবুল হাসানের কঠিন মনেও দাগ কেটেছিল । তবুও তিনি বললেন- সালমা, তুমি কিন্তু সেই আগের মতই রয়ে গেছ । ইসলাম গ্রহণ করা সত্ত্বেও আমি তোমার মাঝে কোন পরিবর্তন দেখছি না । তোমাকে এখন ইসলামের নির্দেশ মত চলতে হবে । যাদের সাথে দেখা দেওয়া নিষেধ তাদের সামনে আশা থেকে বিরত থাকতে হবে । মনে রেখ একজন মুসলিম নারীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভূষণ হচ্ছে লজ্জা ।
  আমি জানি, আপনি এখনও আমার ওপর রেগে আছেন । আপনার কথামত আমি আমার পোশাক পাল্টেছি । নামায পড়ছি । গত পরশু থেকে ঘরের বাহিরেও যাচ্ছি না । এখন কি আমি কোন আত্মীয় মুসলিম পুরুষের সামনেও যেতে পারব না?
  না, পারবে না । আমি তালহাকে এখানে রেখে যাচ্ছি ।  সে তোমাকে একজন মুসলিম নারীর করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ে সব কিছু জানিয়ে দিবে ।  তার কাছ থেকে তুমি কিছুদিনের মধ্যেই ইসলামের সঠিক শিক্ষা লাভ করতে পারবে ।
  আমার অন্য কোন শিক্ষকের প্রয়োজন নেই । আপনার শেখানো পথেই আমি চলব । আপনি যা বলবেন তাই করব । আপনি বললে আমি একটুও না ভেবেই পাহাড় থেকে লাফ দিতে পারি । হাত পা বেঁধে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে পারি ।
  দেখ সালমা, যদি আমার সন্তুষ্টি তোমার এতই প্রিয় হয় তাহলে শোন, আমি শুধু চাই তুমি নিজেকে সম্পূর্ণ ইসলামের রঙে রাঙিয়ে নাও । মনে রেখ প্রকৃত মুসলিম সেই, যে তার প্রতিটি কাজ ও কামনা দ্বারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে । মানুষের সন্তুষ্টির জন্য বৃথা সময় ব্যয় না করে । কালিমা পড়ার পর তুমি সীমাহীন প্রচেষ্টা, কঠিন সাধনা ও অনন্য ত্যাগের এক অচেনা জহতে পদার্পণ করেছ । এ জগতের বাসিন্দাদের মন বেদনার নীল রঙে রাঙাতে নেই । জাগতিক কামনায় অশ্রু ঝরাতে নেই । মুসলমানদের পুরো জীবনটাই পরিক্ষাগার । তার মাঝে বিরাজ করবে এমন এক মন, যা আল্লাহর জন্য জীবনের সকল স্বপ্ন-সাধ হাসিমুখে উৎসর্গ করতে একটুও দ্বীধাবোধ করবে না । তার বুক বিষাক্ত তীরের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হলেও তার মুখ থেকে “আহ” শব্দটুকুও বের হবে না । তুমি কখনও আরবে গেলে হয়ত এ দৃশ্য দেখে হতবাক হবে- মুসলিম নারীরা নিজেদের স্বামী, ভাই ও পুত্রকে নিজ হাতে রণসাজে সজ্জিত করে যুদ্ধে পাঠাচ্ছে । অথচ তাদের চোখে কোন অশ্রুফোঁটা নেই, কপালে নেই কোন চিন্তার রেখা । মনে নেই কোন ভয় । এর একমাত্র কারণ হল তারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে পৃথিবীর সব সন্তুষ্টির ওপর প্রাধান্য দিয়েছে । তুমি যদি শুধু আমার সন্তুষ্টির জন্য ইসলাম গ্রহণ করে থাক, তাহলে অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে- তুমি ইসলামের কিছুই বুঝোনি । যদি তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি চাও, তাহলে ঘরে ফিরে যাও । আমি তালহাকে পাঠাচ্ছি । সে আজ থেকেই তোমাকে কুরআন শিক্ষা দিবে । আমি চাই, আবার যখন আমি ফিরে আসব, তখন আমার সাঁতার বিদ্যার পরীক্ষা নেওয়ার জন্য তীর থেকে এক মাইল দূরে সাগরের পাশে আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে তুমি নিশ্চয় আসবে না । আর তোমাকে খুঁজতে বন-জঙ্গল ও পাহাড়-পর্বত চষে বেড়াতে হবে না । আমি দেখতে চাই, আব্দুস শামসের নাম পরিবর্তনের সাথে সাথে তার ঘরের চিত্রও বদলে গেছে । তার ঘরের চার দেয়ালের মাঝে এক প্রকৃত মুসলিম নারী প্রতিপালিত হচ্ছে ।
  সালমা এক বুক আশা নিয়ে জানতে চাইল- আপনি আবার কবে ফিরবেন?
  সঠিক দিন-ক্ষণ বলতে পারছি না, তবে ইচ্ছে আছে ঘোড়াগুলো কিনা হলেই ফিরে আসব । কিন্তু যদি এর মধ্যে কোথাও জিহাদে যাওয়ার ডাক আসে, তাহলে হয়ত আর ফিরা হবে না । সালমার মুখ নিরাশার আঁধারে মলিন হয়ে গেল । অশ্রুভেজা চোখে সে বলল- না, না, এমন কথা বলবেন না । আল্লাহ্ আপনাকে নিশ্চয়ই ফিরিয়ে আনবেন ।
  তোমার দোয়া সাথে থাকলে ইনশাআল্লাহ্ আমি অবশ্যই ফিরে আসব ।
  দোয়ার কথা কি বলছেন? আমার দোয়া যদি সত্যিই কবুল হত, তাহলে কি আপনি যেতে চাইতেন?
আবুল হাসানের হঠাৎ মনে হল, তিনি যেন একটু বিশিই কথা বলে ফেলছেন । তাই কণ্ঠের কোমলতা কমিয়ে কিছুটা কর্কশ স্বরে বললেন- সালমা, আরব বিশ্বের সব নারীরা যদি তোমার মত এমন নেক দোয়া করত । তাহলে ইসলামের আলো আরবের সীমা অতিক্রম করতে পারত না । সালমা একরাশ লজ্জা নিয়ে বাড়ি ফিরল । পথিমধ্যে মনে মনে নিজেই নিজেকে শাসাতে লাগল- আমি সত্যিই বোকা, না হয় ওকথা বলতে গেলাম কেন? কিছুক্ষণ পর সে বাড়ির ছাদে ওঠল । পশ্চিমাকাশে রক্তিম সূর্যটি সেদিনের মত আলো দান শেষে বিদায় নেওয়ার প্রস্ততি নিচ্ছিল । আকাশজুড়ে খণ্ড খণ্ড শুভ্র মেঘের ছায়া রক্ত রঙে বঞ্জিত হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল । শেষ বিকেলের মৃদু হাওয়া সারিবদ্ধ নারকেল গাছের পাতায় পাতায় দোলা দিয়ে হৃদয় আকূল করা এক অপূর্ব সুর মূর্ছানার সৃষ্টি করছিল ।
চারপাশের এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের সীমা ছাড়িয়ে সালমার কৌতুহলী আঁখিদ্বয় সমুদ্রপাড়ে আরবদের জাহাজের ওপর আকটে আছে । হৃদয়  গহীনে অনুভূত হচ্ছে এক নতুন শিহরন । দু’হাত তোলে সে প্রার্থনা করতে লাগল- হে জল-স্থলের একমাত্র অধিপতি হে অামার প্রভু, অামাকে এক প্রকৃত মুসলিম নারীর ঈমান দাও । সরল সঠিক পথ দেখাও । তিনি ফিরে এসে যেন অামাকে তার মনের মত দেখতে পান ৷
তৃতীয় দিন: অাকাশজুড়ে কাল মেঘের ছড়াছড়ি । বাড়ির ছাদে ওঠে সালমা বিষণ্ন চোখে সমুদ্র পানে তাকিয়ে ছিল । তীর থেকে বহুদূরে উত্তাল ঢেউয়ের তালে দোলয়মান অাবুল হাসানের জাহাজটি দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল । কিছুক্ষণ প্রবল বাতাস বয়ে শুরু হল বৃষ্টিপাত । বৃষ্টির প্রবলতায় সালমার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল । ধীরে ধীরে জাহাজটি দূরে মিলিয়ে গেল । নিজেকে সামলানোর শত চেষ্টার পরেও সালমা তার অশ্রুকে আটকে রাখতে পারল না । বৃষ্টির পানি অার অশ্রুফোঁটা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল । দীর্ঘক্ষণ সে হাত তোলে দুয়া করতে থাকল- হে প্রভু! তুমি তাকে সমুদ্রের সব বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করো ।
  আবুল হাসানের সাথে বাগানে একান্ত সাক্ষাতের পর থেকে সালমার জীবনের আমূল পরিবর্তন দেখা দিল । যদিও তার প্রতি আবুল হাসানের উদাসিনতা, এড়িয়ে চলার মনোভাব তার সরল মনে ব্যথার সৃষ্টি করেছিল । তবুও সে তাকে মানবতার শ্রেষ্ঠতম আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করেছিল । এ ব্যাপারে তার পূর্ণ বিশ্বাস জন্মেছিল, তার যে অভ্যাসগুলো আবুল হাসানের অপছন্দ ছিল সেগুলো অবশ্যই মন্দ । তাই আবুল হাসানের নিষেধের পর থেকে সে অার কোন পর পুরুষের সামনে বের হয়নি ।
   আবুল হাসান ও তার সঙ্গিরা যখন সমুদ্র বন্দরের দিকে রওনা হল, তখন সালমার মনে ঝড় বইতে শুরু করছিল ৷  কয়েকবার ভেবেছিল সে আবুল হাসানের কাছে গিয়ে তাকে বিদায় জানিয়ে আসবে । কিন্তু প্রতিবারই তার বিবেক তাকে বাধা দিল । সে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করতে লাগল, তার হৃদয়ে কি তুমি আছ? বিগত দিনের আবুল হাসানের ব্যবহার কথাবার্তা থেকে সে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে, কিন্তু পেল না । কখনও তার কথা মনে হলে সালমার মনের আকাশ নিরাশার কালো মেঘে ছেয়ে যায় । আবার কখনও অাশার শুকতারাও জ্বলে ওঠে ।
  আব্দুল্লাহ ডাকছেন- সালমা, সালমা!
পিতার ডাকে নিচে নেমে এল সে ৷
  এই ঝড় বৃষ্টিতে একা একা ছাদে কি করছ মা?
  কিছু না আব্বাজান ।  আমি— সালমা মিথ্যা অজুহাত দেখাতে চাচ্ছিল । তখন আবুল হাসানের দেওয়া উপদেশগুলোর কথা মনে পড়ে যাওয়ায় বলল- আমি তাদের জাহাজ দেখছিলাম ।
   তারাতো অনেক আগেই চলে গেছেন । তুমি জলদি গিয়ে ভেজা কাপড় বদলে আসো । তালহা এখনই চলে আসবে । আজ থেকে আমি তার কাছে কুরআন শিখব ।
  আপনি তাকে কোথায় রেখে এসেছেন?
  সে যায়েদের বাড়ি গিয়েছে । এখনি এসে যাবে ৷
অল্প কিছুদিনে তালহার তা’লীমের ফলাফল এই হল যে- সালমা তার প্রতিটি পদক্ষেপ আবুল হাসানের সন্তুষ্টির জায়গায় আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা ভাবতে লাগল । তার পরও আবুল হাসানের জন্যই হত নামাযের পর তার সর্বপ্রথম প্রর্থনা ।
     ছয় মাস অতিক্রম করল । আজও আবুল হাসানের কোন সংবাদ এলনা । সালমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল । ক্রমেই বাড়ছিল তার অস্থিরতা । সকাল-সন্ধ্যা ছাদে ওঠে সমুদ্রপানে চাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে থাকে । বন্দরের দিকে কোন জাহাজ আসতে দেখলেই ভাবতো এই বুঝি আবুল হাসানের জাহাজ আসছে । খাদেমকে দৈনিক কয়েকবার বন্দরে পাঠাত । সে হতাশ হয়ে ফিরে এলে সালমা জিজ্ঞেস করতো- তুমি ভাল করে খুঁজে দেখছ তো? তাদের মধ্যে হয়ত কোন আরব ছিল । খাদেম উত্তর দিত- জাহাজটি আরব থেকে আসেনি, এসেছে অমুক জায়গা থেকে । প্রতিটি যাত্রীর সাথে আমি কথা বলেছি । তাদের মাঝে একজনও আরব ছিল না ।
আশা-নিরাশায় দোদুল্যমান মাঝ সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া অসহায় ব্যক্তি যেমন ভেসে আসা একটি ক্ষুদ্র কাঠখণ্ডের আশ্রয় খোঁজে তেমনই সে বলতো- হায়, যদি তুমি জাহাজের মাল্লাদের জিজ্ঞেস করতে । হয়ত তারা পথে কোন বন্দরে আরব জাহাজ দেখে এসেছে কিংবা শোনে এসেছে । খাদেম আবার বন্দরে ছুটে যেত ।
সালমা পুরনো আশার ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে নতুন আশার প্রাসাদ গড়তো । কিন্তু বৃদ্ধ খাদেম যখন হতাশায় ফিরে এসে মলিন চেহারায় আবার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত সংবাদটি শোনাতো, সালমার মনে তিল তিল করে গড়ে তোলা আশার প্রাসাদটি তখন নিমিষেই ভেঙে চুরমার হয়ে যেত । প্রতিটি ভোরে সে মনের ঘরে নতুন আশার প্রদীপ জ্বালাতো । সন্ধ্যাবেলা যখন সমুদ্রগর্ভে সূর্যটি ডুব দিত । তার আশার প্রদীপটিও তখন হুট করে নিভে যেত । কষ্টগুলো বোবা কান্নায় অঝোরে ঝরে পড়তো । অনেকদিন পর্যন্ত সালমা তার মনের কষ্ট মনেই পুষে রেখেছিল ৷ কাউকেই কিছু বুঝতে দেয়নি । এমনকি তালহা বা তার প্রিয় আব্বাজানকেও না ৷
   এক সন্ধ্যায় বাহিরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল ৷ আব্দুল্লাহ ও তালহা বারান্দায় বসে কথা বলছিল । সালমা জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখছিল । তাদের আলোচনার এক পর্যায়ে আবুল হাসানের প্রসঙ্গ আসল ।
  আব্দুল্লাহ বললেন- আচ্ছা প্রায় আট মাস হয়ে গেল, আবুল হাসান এখনও ফিরছেন না কেন? আল্লাহই জানেন তার কি হয়েছে ৷
  আল্লাহর রহমতে তিনি যদি সামুদ্রিক বিপদ এড়িয়ে আরবে পৌঁছে থাকেন, তাহলে এখন পর্যন্ত তার ফিরে না আসার কারণ একটাই হতে পারে আর তা হল তিনি কোথাও জিহাদ করতে চলে গিয়েছেন ।
  আজ দিলিপ সিং আমাকে বলল, এখান থেকে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে মালাবারের একটি জাহাজ নাকি ডুবে গেছে, শুধু পাঁচজন যাত্রী নিয়ে একটি নৌকা তীরে পৌছাতে পেরেছে ।
  জাহাজে যাত্রী কতজন ছিল?
  সম্ভবত বিশজন, জাহাজটি ছোট নয়, বেশ বড় ৷ এতে বহু পণ্যসামগ্রী ছিল ৷
  কিন্তু ওটা ডুবল কিভাবে?
  তীর কাছে দেখে নাবিক কিছুটা বেপরওয়া হয়ে গিয়েছিল, তারপর এক বিশাল আকার পাথর খণ্ডে হঠাৎ ধাক্কা লেগে জাহাজটি টুকরো টুকরো হয়ে যায় ।
   অনুবাদ:
রাশিদুল ইসলাম ফারাবী 
  সম্পাদনা
 রাসেল মড়ল

1 thought on “মুহাম্মাদ বিন ক্বাসিম: নাসিম হিজাযী: পার্ট-১”

Comments are closed.