মুহাম্মাদ বিন ক্বাসিম: নাসিম হিজাযী: পার্ট-২

Spread the love

মুহাম্মাদ বিন ক্বাসিম: নাসিম হিজাযী: পার্ট-২

তীর কাছে দেখে নাবিক কিছুটা বেপরওয়া হয়ে গিয়েছিল, তারপর এক বিশাল আকার পাথর খণ্ডে হঠাৎ ধাক্কা লেগে জাহাজটি টুকরো টুকরো হয়ে যায় । পাশের রুমে বসে সালমা রিমঝিম বৃষ্টির অপরূপ সৌন্দর্য উদাসী মনে চোখ বুলাচ্ছিল । শুধু শেষের কয়েকটি কথা তার কানে পৌঁছল । মূহুর্তের জন্য তার রক্ত সঞ্চালন যেন থেমে গেল।
এসব পাথরের খণ্ডগুলো জাহাজের জন্য খুব ভয়ংকর হয়ে থাকে । বারান্দা থেকে আব্দুল্লাহর কণ্ঠে ভেসে এল । এর কারণে প্রতি বছর অনেক জাহাজ ডুবে যায় । স্থানীয়রা মনে করে এগুলো সমুদ্র দেবতার মন্দির । এ কথা শোনা মাত্রই সালমার শিরা-উপশিরায় অস্বাভাবিক উত্তেজনার সৃষ্টি হল দ্রুত গতিতে ঘর থেকে বের হয়ে পিতার সামনে এসে দাঁড়াল ৷ তার ভীতিমাখা চেহারা ও অস্থির চাহনী দেখে আব্দুল্লাহ জানতে চাইলেন- মা, তোমার কি হয়েছে?
সালমা নিশ্চুপ শোকে বিমূঢ় । কোন কথাই তার মুখ থেকে বের হচ্ছিল না । তার বেদনার উদাসীন চাহনী বলে যাচ্ছিল- আমার কাছ থেকে আপনারা যা লুকাতে চেয়েছিলেন, আমি তা শোনে গেছি । তালহা পেরেশান হয়ে জিজ্ঞেস করল- বল মা, তোমার কী হয়েছে ?
সালমার ঠোঁট কাঁপছিল । উদাস দু’ চোখে অশ্রুর ঢল, কোনমতে কান্না চেঁপে রেখে বলল- বলুন তার জাহাজ কবে ডুবেছে? আপনি কার কাছে শোনেছেন? আর তিনি—? চুপ করে আছেন কেন? আল্লাহর দোহাই লাগে আমাকে সব বিস্তারিত বলুন । আমি যে কোন দুঃসংবাদ শোনতে প্রস্তুত আছি । শোকের প্রবলতায় তার কণ্ঠ থেমে আসছিল ।
ভীত হয়ে আব্দুল্লাহ বললেন- আমরা মালাবারের একটি জাহাজের কথা বলছিলাম । আজ সকালেই দিলিপ সিংয়ের কাছে শোনেছি । তিনি বলেছিলেন…।
পিতার কথা শেষ না হতেই সালমা বলে ওঠল- না, না, আপনি আমার কাছে সত্যটা গোপন করছেন । আমাকে মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করবেন না । বলেই ফুঁপিয়ে কেঁদে কেঁদে পাশের ঘরে চলে গেল ।
মেয়ের এমন অদ্ভুত আচরণ পিতা আগে কখনও দেখেনি । তিনি হয়ত কিছু বুঝলেন বা বুঝলেন না । তালহার দিকে ক্ষমা চাওয়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে সালমার ঘরে চলে গেলেন ৷ বিছানায় উপুড় হয়ে আঁচলে মুখ লুকিয়ে সালমা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল । বৃদ্ধ পিতার কোমল হৃদয় বিষণ্নতায় ছেয়ে গেল । তিনি মেয়ের পাশে বসে গভীর স্নেহে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন- তোমার কি হয়েছে মা? আমাকে বল ।  মুহাম্মাদ বিন ক্বাসিম: নাসিম হিজাযী: পার্ট-১
সালমা ওঠে বসল- দু’হাতে চোখের পানি মুছে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল- কিছু না আব্বাজান, আমাকে ক্ষমা করুন, আর কখনও আমি এভাবে কাঁদব না ।
কিন্তু হঠাৎ তোমার এভাবে কান্নার কারণ কি? মালাবারের একটি জাহাজ ডুবেছে এ আবার নতুন কি? এমন সংবাদ তো আমরা প্রায়ই শোনি ।
সালমা গভীর দৃষ্টিতে পিতাকে দেখে নিয়ে অনেকটা আশ্বস্ত হয়ে বলল- আপনি সত্যি বলছেন তো আব্বাজান?
আমি অযথা মিথ্যা বলতে যাব কেন? আজ পর্যন্ত আমার কোন কথায় তুমি সন্দেহ করনি । কিন্তু আজ হঠাৎ কি হল তোমার? ঠিক আছে । আমার কথা বিশ্বাস না হলে তুমি তালহাকে জিজ্ঞেস করে দেখ ৷
আব্দুল্লাহর কণ্ঠে কিছুটা বিরক্তি ঝরল । সালমা লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল-
আব্বাজান আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি । আসলে আমি ভেবেছিলাম আপনারা আরবদের জাহাজ নিয়ে আলোচনা করছিলেন ।
তুমি কী মনে করো মা, আল্লাহ না করুন- যদি আরবদের কোন জাহাজ সম্পর্কে এমন দুঃসংবাদ আসে, তোমার চেয়ে আমি কম কষ্ট পাবো?

রাতের খাবার শেষে তালহা, আব্দুল্লাহ ও তার খাদেম ইশার নামায পড়ছিলেন ৷ খাদেম থালা-বাসন পরিষ্কার করছিল । এমন সময় দরজার কড়া নাড়ার শব্দ হল ।
সালমা খাদেমকে বলল- দেখ তো মনে হয় যায়েদ ও কায়েস এসেছে । তুমি কি বাহিরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছ?
এমন ঝড় বৃষ্টিতে আর কে আসবে? আমি একটু আগেই দরজা বন্ধ করে এসেছি । তারা অাসলে মাগরিবের আগেই চলে আসতো । তাছাড়া যায়েদ অসুস্থ অার কায়েস তো বৃদ্ধ মানুষ । ঘরেই হয়ত নামায পড়ে নিবে ৷
কিন্তু কে যেন দরজায় কড়া নাড়ছে ।
অাপনি মনে হয় ভুল শোনছেন । হয়ত বাতাসে দরজায় শব্দ হচ্ছে ।
না, না, ঐতো কার অাওয়াজ শোনা যাচ্ছে । হয়ত…… অাচ্ছা অামি যাচ্ছি ।
সালমার হৃদপিণ্ডে চিনচিন করছিল । ঘোর অাঁধারে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না । বিজলির ক্ষণিক আলোয় নিজেকে কোন রকম গাছের ডালপালা থেকে বাঁচিয়ে গেট পর্যন্ত পৌঁছল । বাহিরে  কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে নিরাশ হয়ে সে ফিরেই যাচ্ছিল, ঠিক তখন কে যেন দরজায় সজোরে ধাক্কা দিয়ে বলল- কেউ অাছেন?
এক মুহুর্তের জন্য সালমার পা যেন মাটিতে অাটকে গেল । তখনই দ্রুত পায়ে এগিয়ে দরজা খোলে দিল । সালমার সামনে দীর্ঘকায়-সুঠাম দেহ বিশিষ্ট এক ব্যক্তি দণ্ডয়মান । দরজা খোলতেই সে জানতে চাইল- এটা কি জনাব অাব্দুল্লাহর বাড়ি? সালমা জবাব দেওয়ার অাগেই বিদ্যুত চমকালে অাবুল হাসান তাকে চিনতে পেয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে করতে বললেন-ওহ, তুমি? দুঃখিত, অামার জন্য তোমাকে বৃষ্টিতে ভিজতে হল ।
মনে মনে সালমা বলতে লাগল- হায়, যদি অাপনি জানতেন বৃষ্টির এ ফোঁটাগুলো আজ আমার জন্য  কত অানন্দ বয়ে এনেছে । তারপর আবুল হাসানকে বলল- চলুন ।
আবুল হাসানের কণ্ঠ শোনতে পেয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অাব্দুল্লাহ ও তালহা বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল ।
আব্দুল্লাহ বললেন- কে? আবুল হাসান?
জ্বী, আমি । বারান্দায় সিঁড়িতে পা রাখতে রাখতে আবুল হাসান বললেন আমি দুঃখিত, এই অসময়ে এসে অাপনাদেরকে কষ্টে ফেলে দিলাম ।
তালহা বলল- অাপনি ভাল অাছেন তো? আপনার সঙ্গিরা কোথায়?
তারা সবাই ভাল অাছে । অামি তাদেরকে জাহাজে রেখে এসেছি । এখানে পৌঁছতে এত ঝামেলায় জড়াতে হবে ভাবিনি । রাস্তায় একবার হোঁচট খেয়েছি ।  দু’বার নদীতে পড়েছি । আপনার বাড়ি মনে করে আরও পাঁচ-ছয় বাড়িতে কড়া নেড়েছি । এক বাড়ির কুকুরের তাড়াও খেয়েছি ।
আব্দুল্লাহ সালমাকে ডাকলেন ৷ সালমা আনন্দে আত্মভোলা হয়ে বারান্দার খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে ছিল । আজও তার অশ্রুগুলো বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর সাথে মিলেমিশে একাকার হচ্ছিল । এ অশ্রুধারা যে বিষাদের নয় বড় আনন্দের । পিতার ডাকে নিজেকে জাগিয়ে বলল- জ্বী আব্বাজান ৷
যাও মা তাঁর জন্য শুকনো কাপড় ও খাবার নিয়ে এসো । আর অন্য মেহমানদের জন্যও খাবার তৈরি কর । আমি তাদেরকে আনতে যাচ্ছি ।
আবুল হাসান বললেন- আমরা সবাই খেয়েছি । আপনি শুধু শুধু কষ্ট করবেন না ।
ভিজা কাপড় বদলে নিয়ে আবুল হাসান আব্দুল্লাহ ও তালহার সাথে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বললেন । দেরি করে ফিরার কারণ জানালেন- বিশেষ একটি অভিযানে তাকে বসরা থেকে আফ্রিকা যেতে হয়েছিল । অবশেষে সাতদিন পর সালমার স্বপ্ন সত্যি হয়ে দেখা দিল । আবুল হাসান ও সালমা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হল ।
তিন বছর পর আবুল হাসান নিজের জন্য শহরে একটি বাড়ি বানালেন । বাড়ির পাশেই নির্মাণ করলেন একটি মসজিদ । তাকে অনুসরণ করে তার কিছু সঙ্গিও বসত বাড়ি করে এখানে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন । আবুল হাসান ও তালহা দ্বীন প্রচারের ধারাবাহিকতায় মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই স্থানীয় কয়েকটি পরিবার ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিলো ৷ মুসলিম ছেলে-মেয়েদের সুশিক্ষার জন্য আবুল হাসান একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করলেন । মাদরাসাটি পরিচালনার দায়িত্ব দেন তালহার ওপর ।
এদিকে আল্লাহর সহযোগিতায় ব্যবসা বাণিজ্যে উন্নতি হতে লাগল । বিয়ের দ্বিতীয় বছর তাদের সুখের সংসার আলোকিত করে একটি পুত্র সন্তান এবং চতুর্থ বছর একটি কন্যা সন্তান জন্ম নিলো । ছেলের নাম রাখলেন খালিদ এবং মেয়ের নাম রাখলেন নাহিদ । দশম বছরে সালমার কোলজুড়ে আরেকটি পুত্র সন্তান জন্ম নিয়েছিল, কিন্তু সে তিন মাস পরেই মারা যায় । খালিদের যখন সাত আর নাহিদের পাঁচ বৎসর, তখন সালমার পিতা আব্দুল্লাহ কয়েকদিন জ্বরাক্রান্ত থেকে পরলোক গমন করেন ।

আবুল হাসানের অর্থ-সম্পদের কমতি ছিল না । স্ত্রী-সন্তানদের প্রতি ছিল তার গভীর মমতা-ভালবাসা । সব মিলে ছোট সংসারে সুখের কোন ঘাটতি ছিল না । তবে এই সুখের সংসার, মায়ার বাঁধন ঘরের চার দেয়ালের মাঝে তাকে বন্দী রাখতে পারেনি ৷ প্রায় প্রতি বছরই দীর্ঘ সমুদ্র সফরে সীমাহীন কষ্ট অতিক্রম করেও তিনি হজ্জ্ করেতে যেতেন । তিনি পাঁচবার এশিয়া মহাদেশ ও আফ্রিকার মুজাহিদদের সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন । প্রতিবার জিহাদ বা হজ্জ্ থেকে ফিরে এসে তিনি নিজ সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা ও যুদ্ধ বিদ্যার পরীক্ষা নিতেন । তীর নিক্ষেপন, ঘোড় দৌড়, তরবারি চালনা ও জাহাজ পরিচালনায় খালিদ নিজেকে তার যোগ্য পিতার সন্তান হিসাবে প্রমাণ করে দেখিয়েছিল ।
এদিকে নাহিদ তীর চালনার পারদর্শিতা ছাড়াও অবাধ্য ঘোড়া দৌড়ানোর কৌশল মাত্র বার বছর বয়সেই আয়ত্ত করে নিয়েছিল । লেখা পড়ার ক্ষেত্রে তার তীক্ষ্ণ মেধা ও অসাধারণ প্রতিভার বিষয়টি তার শিক্ষক তালহা সরল মনেই স্বীকার করতো । রাজার সাথে আবুল হাসানের বন্ধুত্বপূর্ণ নিদারুণ সম্পর্ক ছিল । রাণী ছিলেন সালমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী । তিনি প্রতি সপ্তাহে দু’ একবার শাহী পালকী পাঠিয়ে মা ও মেয়েকে রাজ প্রাসাদে নিয়ে আসতেন । নাহিদের সাথে রাজকুমারীর সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিল, মাঝে মাঝে নাহিদের সাথে দেখা করতে আবুল হাসানের বাড়িতে চলে আসতো । রাজকুমার খালিদের চার বছরের বড় ছিল । তবুও প্রতিটি বিষয়ে খালিদকে নিজের আদর্শ মনে করতো । একদিন দিলিপ সিং রাজার কাছে খালিদের অসাধারণ প্রতিভা ও যুদ্ধ বিদ্যার পারদর্শিতার অনেক প্রশংসা করে । তখন রাজা জানতে চাইলেন- আচ্ছা, সে কি রাজকুমারের সাথে মুকাবেলা করতে পারবে ?  মুহাম্মাদ বিন ক্বাসিম: নাসিম হিজাযী: পার্ট-১
দিলিপ সিং বলল- মহারাজ রাজকুমার আমাদের সবার গৌরব । তিনি রাজ প্রাসাদে বিশাল ঐশ্বর্য চিত্তের মাঝে বড় হয়েছেন । ওদিকে খালিদ হল এক বীর যোদ্ধার সন্তান ।
কিন্তু সে তো এখনও ছোট ।
মহারাজ, আরব মায়েরা যদি তাদের সন্তানদেরকে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা-দীক্ষা ও যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী করে না তোলতো,  তবে তারা আজ অর্ধ পৃথিবীর অধিকারী হতে পারতোনা ৷ শোনেছি আরব মায়েরা তাদের বার-চৌদ্দ বছরের সন্তানদেরকেও নিজ হাতে হাসি মুখে যুদ্ধসাজে সাজিয়ে যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়ে দেন ৷
খালিদের বয়স এখন কত হবে ?
মনে হয় বার বছর হবে, মহারাজ ।
আরব সন্তানদের মাঝে এমন কি গুণ রয়েছে, যা আমাদের সন্তানদের মাঝে নেই ?
মহারাজ, আমাদের ও তাদের মাঝে রয়েছে প্রচুর ব্যবধান । আমরা অসংখ্য দেব-দেবীর পুজা করি । এমনকি আমরা আমাদের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী পৃথিবীর প্রত্যেকটি বস্তুকেই দেবতার আসনে বসিয়ে থাকি । যেমন চলার পথে কোন সুবিশাল পর্বতের মুখোমুখি হলে নিজ শক্তিতে তাকে জয় করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করেই ওটাকে দেবতা ভেবে উপাসনা করতে শুরু করি । কিন্তু তারা একমাত্র আল্লাহকেই প্রভু হিসাবে মানে ও বিশ্বাস করে । তিনি ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোন মহাশক্তির সামনে মাথানত করাকে চরম পাপ মনে করে । তাদের আরেকটি সুদৃঢ় বিশ্বাস হল- মৃত্যু মানব জীবনের সমাপ্তি ঘটায় না ৷ বরং মৃত্যুর পর থেকে শুরু হয় এক নতুন জীবনের । আমার মনে পড়ছে আবুল হাসান একদিন আমাকে বলেছিলেন- খালিদ বিন ওয়ালিদ নামের এক মুসলিম সেনাপতি যখন সদলবলে সিরিয়া আক্রমনের জন্য অগ্রসর হচ্ছিল, তখন সিরিয়ার শাসনকর্তা অহংকার দেখিয়ে তাকে লিখেছিল- তুমি এক সুবিশাল পর্বতের সাথে টক্কর দিতে যাচ্ছো, তোমার চল্লিশ হাজার সৈন্যের মোকাবেলার জন্য আমার আড়াই লক্ষ সৈন্য প্রত্যেকেই আধুনিক অস্র-শস্রে সুসজ্জিত হয়ে প্রস্তুত রয়েছে ৷ জবাবে মুসলিম সেনাপতি কী লিখেছিলেন জানেন? তিনি লিখেছিলেন- ‘তোমার শক্তির পরিধি আমার জানা আছে । কিন্তু তুমি হয়ত একটি বিষয় জানো না, তোমার সৈন্যদের অন্তরে যে পরিমাণ বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা আছে, তার চেয়ে সহস্রগুণ বেশি শাহাদাতের কামনা রয়েছে আমার সৈন্যদের হৃদয়ে ।’
রাজা বললেন- দিলিপ সিং আমার মনে একান্ত ইচ্ছা রাজকুমারকে যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী করে তোলার দায়িত্ব আবুল হাসানকে অর্পণ করি ৷ তুমি আজেই তার সাথে দেখা করে আমার মনের ইচ্ছাটি খোলে বল ৷ তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করলে এর জন্য আমি তাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিব ।
রাজার পক্ষ থেকে দিলিপ সিং এ প্রস্তাব পেশ করলে আবুল হাসান সানন্দেই তা গ্রহণ করলেন । কিন্তু পারিশ্রমিক নিতে অসম্মতি জানালেন ৷

টানা দু’ বছর প্রশিক্ষণের পর আবুল হাসান রাজাকে বললেন- এখন আপনার পুত্র যুদ্ধ বিদ্যায় এ দেশের শ্রেষ্ঠ বীরের সাথেও লড়াই করতে সক্ষম ।
রাজা জিজ্ঞেস করলেন- আমি জানতে চাই রাজকুমার এখন তীরন্দাজী ও ঘোড় দৌড়ে খালিদের সমকক্ষ হতে পেরেছে কি না ?
উত্তরে আবুল হাসান বললেন- খালিদ তো সেই বয়স থেকেই তীর-ধনুক চালানো শুরু করেছে, যে বয়সে রাজকুমার খেলা-ধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন । যে বয়সে খালিদ ঘোড়ার পিঠে বসতে শিখেছে, সে বয়সে রাজকুমার কর্মচারীদের কাঁধে চড়ে ঘুরে বেড়াতেন ৷ জন্মগতভাবেই খালিদ একজন যোদ্ধা । আর রাজকুমার একজন শাহজাদা ।
আচ্ছা, তরবারি চালনায় রাজকুমার কেমন পারদর্শী ?
খালিদের থেকে বয়সে তিনি বড় ৷ তাই স্বভাবতই তার বাহুতে শক্তি বেশি । অবশ্য আমি তাদের দু’জনকে মুকাবেলা করিয়ে দেখিনি ৷ তবে আমার ধারণা রাজকুমার তরবারি চালনায় খালিদের তুলনায় অধিক পারদর্শী । রাজা পুত্রকে কাছে ডেকে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন- কি রাজকুমার, উস্তাদের ছেলেকে তোমার তরবারির যাদু দেখাতে রাজি আছো ?
না আব্বাজান, সে আমার থেকে ছোট । তার কাছে আমি হেরে গেলে ভীষণ লজ্জা পাব । সে হেরে গেলেও আমার লজ্জা করবে । এই বলে রাজকুমার সবিনয়ে পিতার অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন । দেখতে দেখতে আবুল হাসান ও সালমার বিয়ের আঠারো বছর পূর্ণ হয়ে গেল ৷ এখন খালিদের বয়স ষোল আর নাহিদের চৌদ্দ ৷ খলীফা ওয়ালিদ সিংহাসনে বসার পর থেকেই মুসলমানদের বিজয় অভিযান এক নতুন রেখা পেয়েছে ।
একবার সিন্ধি বণিকদের একটি জাহাজ এল । তাদের সাথে আম্মানের এক খৃষ্টানও ছিল । সিন্ধির বণিকেরা লংকা দ্বীপের আরব বাসিন্দাদের কাছে তুর্কিস্তান ও উত্তর আফ্রিকার মুসলমানদের গৌরবময় বিজয়গাঁথা বর্ণনা করছিল । আম্মানের ঐ খৃষ্টান বণিকও তাদের কথার সত্যায়ন করছিল ৷ আবুল হাসান ও তার কয়েকজন সঙ্গি হজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন । এখন তাদের হজের আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি জিহাদে যাওয়ার প্রেরণাও যুক্ত হল ৷ বৈদেশিক বণিকদের কাছে আরবের নতুন নতুন রাজ্য জয়ের সুসংবাদ রাজা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শোনলেন ।  মুসলমানদের ধারাবাহিক রাজ্য জয়ের তাজা কাহিনী শোনে রাজা খুব আনন্দিত হলেন । তিনি আবুল হাসানকে ডেকে মুসলিম খলীফা ও ইরাকের শাসনকর্তার কাছে স্বর্ণ ও মণি-মুক্তার কিছু মূল্যবান উপহার পাঠানোর ইচ্ছা প্রকাশ করলেন ৷
উত্তরে আবুল হাসান বললেন- আমি অত্যন্ত আনন্দচিত্তে আপনার দেওয়া উপহারগুলো তাঁদের কাছে পৌঁছে দিব । সিন্ধির বণিকেরা তাদের আনীত পণ্য বিক্রয় করে নতুন পণ্যসামগ্রী ক্রয় করে ফিরে গেল । এর কয়েকদিন পরই আবুল হাসান ও তার সঙ্গিরা হজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন । এ বছর লংকা দ্বীপের নব মুসলিম ছাড়াও হজগামী আরবদের সংখ্যা অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি ছিল ৷
তালহা ও আরো তিনজন আরব বণিক হজগামীদের বাসা-বাড়ি দেখাশোনা করার জন্য রয়ে গেল । কিছু আরব তাদের ছোট বাচ্চাদেরকে তালহার তত্ত্বাবধানে রেখে স্ত্রীদের নিয়ে চলে গেল আর কিছু আরব পরিবারকে ঘরে রেখে গেল ৷
আবুল হাসানের ইচ্ছা ছিল এবার সপরিবারে হজে যাবেন । কিন্তু সালমা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় সিদ্ধান্ত বদলাতে হল ।

নতুন পাখা গজানোর পর ঈগলছানা যেমন নীল আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানোর জন্য অস্থির হয়ে থাকে, তেমনই খালিদও যুদ্ধক্ষেত্রে নিজ বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য উদ্গ্রীব হয়ে ছিল ৷ কিন্তু মায়ের অসুস্থতা তাকে ঘরে আবদ্ধ থাকতে বাধ্য করল ৷  আবুল হাসান ওয়াদা করলেন তিনি হজ্ থেকে ফিরেই তাকে আরব সফরে পাঠাবেন । বিদায়ের দিন প্রচণ্ড জ্বরাক্রান্ত ছিল সালমা । শরীরজুড়ে অসহ্য যন্ত্রণা থাকা সত্ত্বেও স্বামীকে বিদায় দেওয়ার সময় বিছানা ছেড়ে ওঠে পড়ল । অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মিনতি জানালো- দেখুন, আমি একদম ঠিক আছি । দয়া করে আমাকে সাথে নিয়ে চলুন । আপনার প্রতিজ্ঞা পূরণ করুন ।
না সালমা । জাহাজের ঠাণ্ডা আবহাওয়া তুমি সহ্য করতে পারবে না । তুমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠো, পরের বার তোমাকে অবশ্যই সাথে নিয়ে যাব ৷ আর শোনো, তোমার সেবা-শুশ্রূষার জন্য খালিদ ও নাহিদকে রেখে যাচ্ছি ৷ এছাড়া তালহাও নিয়মিত তোমার দেখাশোনা করবে ।
অশ্রুজল চোখে সালমা বলল- না, না । আমাকে এবারই নিয়ে চলুন । আপনি পাশে থাকলে আমি সব কষ্ট সয়ে নিতে পারব ৷
জিদ করো না সালমা । দেখ তোমার নাড়ি কেমন দ্রুত গতিতে চলছে । জ্বরের কারণে তোমার চেহারা কেমন লাল হয়ে আছে ৷ তাছাড়া তুমি কখনো সমুদ্র ভ্রমন করোনি । দেখ, এবার আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসব ।
না, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, আপনার এবারের সফর অনেক দীর্ঘ হবে । হয়ত আমি এতটা দিন অপেক্ষা করতে পারব না ।
ব্যথিত চেহারায় আবুল হাসান বললেন- সালমা, তুমি কাঁদছো? মনে করে দেখ কয়েক বছর আগে আমি বলেছিলাম মুজাহিদদের বিদায়বেলা মুসলিম নারীরা চোখের পানি ফেলে না ।
কথাটি সালমার ওপর যাদুর মত প্রভাব ফেলল । চোখের পানি মুছতে মুছতে মৃদু হাসির চেষ্টা করে বলল- আপনি যাচ্ছেন বলে আমি এতটা ব্যথিত নই, আমাকে সাথে না নিয়ে রেখে যাচ্ছেন বলে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ৷ আমাকে যদি একটিবারের জন্য জিহাদের ময়দানে নিয়ে যেতেন, তাহলে হয়ত আর দূর্বলতার অপবাদ দিতেন না ৷ আপনার সাথে আমি তীরবৃষ্টির মাঝেও দাঁড়িয়ে থাকতে পারব । কিন্তু প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় আপনার অপেক্ষায় ছাদে গিয়ে সমুদ্র পানে চেয়ে চেয়ে ধৈর্যের পরীক্ষা
আমার জন্য কঠিণ যন্ত্রণাদায়ক ৷
আবুল হাসান বললেন- এ ধৈর্যই তো নারীদের জন্য জিহাদ ৷ পুরুষেরা যে কাজ জিহাদের ময়দানে করতে পারে না, নারীরা অনায়াশে ঘরে বসেই তা করতে পারে । নারীরা খালিদ বা মুছান্না হতে পারে না । কিন্তু তাদের গর্ভধারিণী মা হওয়ার মর্যাদা লাভ করতে পারে । আজ আমাদের মুজাহিদ ভাইয়েরা বাড়ি থেকে শত শত মাইল দূরে গিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করছে । তাদের মনোবল দৃঢ় রেখেছে ঐসকল নারীরা যারা অত্যন্ত ধৈর্য ও ত্যাগ স্বীকার করে ঘরের মধ্যে মা, বোন ও স্ত্রীর দায়িত্ব যথাযথরূপে পালন করছে । তাদের প্রতি চরম আস্থা আছে বলেই জিহাদ রত মুজাহিদ ভাইদের মনে ছোট ভাই, বোন ও আদরের সন্তানদের কথা ভেবে চিন্তায় পড়তে হয় না । এবার তুমিই বল সালমা, যদি কোন মুজাহিদ সর্বদা এই দুশ্চিন্তায় ব্যাকুল থাকে যে, তার স্ত্রী তার জন্য কেঁদে কেঁদে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তার সন্তানেরা অলিতে গলিতে মাথা খুঁড়ে মরছে, তাহলে কি সে কখনো জিহাদের ময়দানে বীরের মত লড়াই করে হাসি মুখে জীবন উৎসর্গ করতে পারতো? মনে কর আমিই যদি আর ফিরে না আসি, তাহলে কি তুমি আরবের অন্যান্য মায়ের ন্যায় খালিদকে জিহাদে পাঠাবে না?
জবাবে সালমা বলল- বিশ্বাস করুন, আপনি যদি খালিদের অযোগ্য পিতা হওয়াকে মেনে নিতে না পারেন, তবে আমিও তার অযোগ্য মা হওয়াকে অপছন্দ করি ৷  মুহাম্মাদ বিন ক্বাসিম: নাসিম হিজাযী: পার্ট-১

সন্ধ্যায় আবুল হাসানের জাহাজ ছাড়ল । নাহিদকে সাথে নিয়ে সালমা ছাদে ওঠে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল । শত চেষ্টার পরও তার অশ্রু বাঁধ মানল না । নাহিদ বলল- আম্মাজান, আপনি কিন্তু আব্বাজানের সাথে ওয়াদা করেছিলেন আমাদের সামনে কাঁদবেন না ৷
চোখের পানি মুছতে মুছতে সালমা বলল- কি করব মা বল? আমি যে নিজেকে সামলাতে পারছি না । তোমার আব্বাজানের তুলনায় আমার মন অনেক দূর্বল । এতটুকু বলেই সালমা নিচে বসে পড়ল ।
নাহিদ তার নাড়ির ওপর হাত রেখে বলল- আম্মাজান, আপনার গায়ে এখনো প্রচণ্ড জ্বর ৷ চলুন বিছানায় গিয়ে শুবেন ৷

   অনুবাদ:
রাশিদুল ইসলাম ফারাবী 
  সম্পাদনা
 রাসেল মড়ল