হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর জীবনী

Spread the love

তাঁর নাম ও বংশ:

নাম: আবু বকর সিদ্দিক (রা.), তিনি আবু বকর  নামে খ্যাত ছিলেন । হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর পরে তিনিই হয়েছিলেন ইসলামের ইতিহাসে প্রথম খলিফা । তার পুরো নাম আবদুল্লাহ ইবনে আবু কুহাফা উসমান বিন আমের আল কুরেশি আল তাইমি । তাঁর বংশধারা মুররাহ বিন কা’ব-এর ছয় প্রজন্মের আগে নবী (সা.) এর সাথে মিলিত হয়েছে । আবু বকর  (রা.) হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর জন্মের দুই বছর কয়েক মাস পরে ৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন । আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁর শালীন ও উত্তম পিতা-মাতার মধ্যে লালিত-পালিত হয়েছিলেন । এইভাবে তিনি যথেষ্ট আত্মমর্যাদাবান এবং সম্ভ্রান্ত মর্যাদা অর্জন করেছিলেন । মক্কার বিজয় দিবসে তাঁর পিতা উসমান আবু কুহাফা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । তাঁর মা সালমা বিনতে সাখার, যিনি উম্মুল খায়ের নামেও পরিচিত, তিনি প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় চলে আসেন ।

তাঁর শারীরিক অবয়ব:

আবু বকর (রা.) হালকা কাঁধ, পাতলা চেহারা, ডুবে যাওয়া চোখ, ছড়ানো কপাল এবং তাঁর আঙ্গুলের গোড়া চুলহীন ছিল  [ যেমন তাঁর কন্যা হযরত আয়েশা (রা.) তাঁর বাবা আবু বকর সিদ্দিকের (শারীরিক রূপ) বর্ণনা করেছেন ]

তার জীবনের প্রথম পর্যায়:

আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তাঁর শৈশবকাল বেদুইনদের মধ্যে এই সময়ের অন্যান্য আরব শিশুদের মতোই কাটিয়েছেন । শুরুর বছরগুলিতে তিনি উটের বাছুর এবং ছাগলের সাথে খেলতেন এবং উটের প্রতি তার ভালবাসার কারণেই তাকে “আবু বকর” ডাকনাম দেয়া হয়েছিল, যার অর্থ ‘উটের বাছুরের পিতা’ ।

১৮ বছর বয়সে ৫৯১ খ্রিস্টাব্দে আবু বকর (রা.) বানিজ্য করে কাপড় ব্যবসায়ী হিসেবে পেশা গ্রহণ করেন, যা ছিল তাঁর পারিবারিক ব্যবসা । চল্লিশ হাজার দিরহামের মূলধন নিয়ে তিনি তার ব্যবসা শুরু করেছিলেন । আসন্ন বছরগুলোতে আবু বকর (রা.) কাফেলা (একের পর এক যাত্রী বহনকারী উটগুলির ধারাবাহিক) নিয়ে ব্যাপক ভ্রমণ করেছিলেন । ব্যবসায়িক ভ্রমণ তাকে ইয়েমেন, সিরিয়া এবং বর্তমান মধ্য প্রাচ্যের আরও অনেক দেশে নিয়ে গেছে । যাতে তাঁর ব্যবসায় ব্যাপক প্রসার লাভ করে । পিতার জীবদ্দশাতেই আবু বকর (রা.) আরব উপজাতির ইতিহাস (বংশানুক্রমিক জ্ঞান), রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে জ্ঞান ও তাঁর অনেক গুণাবলীর কারণে তাঁর উপজাতির প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন ।

আবু বকর সিদ্দিক (রা.) উল্লেখযোগ্য পুণ্যবান ব্যক্তিত্ব ছিলেন । ইসলামের পূর্বেও তিনি নিজের জন্য নেশা নিষিদ্ধ করেছিলেন । একবার একজন তাকে জিজ্ঞাসা করলেন:

“আপনি কি কখনও মাদক পান করেছেন ?”

আবু বকর (রা.) জবাব দিয়েছেন:

“আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি, আমি কখনও তা করি নি ।”

লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করলেন:

“কেন ?”

তিনি বলেছিলেন:

“আমি আমার সম্মান বজায় রেখেছি এবং আমার মর্যাদা রক্ষা করছি ।”

আবু বকর সিদ্দিক (রা.) কখনও মূর্তিগুলোকে সিজদা করেননি । একবার হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর সাহাবাদের সমাবেশে আবু বকর (রা.) বলেছেন:

“আমি কখনই কোনও প্রতিমাতে সিজদা করিনি । আমি যখন যৌবনের দিকে এগিয়ে এসেছি, তখন আমার বাবা আমাকে প্রতিমার একটি ঘরে নিয়ে গেলেন । বাবা বলেছিলেন: “এগুলো তোমার মহিমান্বিত দেবতা ।”

এই কথা বলার পরে, আমার বাবা অন্য কোনও ব্যবসায়ের সাথে যোগ দিতে চলে গেলেন । আমি একটি প্রতিমার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলেছিলাম: “আমি ক্ষুধার্ত হয়েছি আপনি আমাকে খাওয়াতে পারবেন ?” কিন্তু এদের কোনও উত্তর নেই I আমি বলেছিলাম: “আমার সুন্দর পোশাকের প্রয়োজন; সেগুলো আমাকে প্রদান করুন ।” এতেও কোনও উত্তর দেয়নি । আমি তার উপরে একটি শিলা ফেলেছিলাম এবং এটি পড়ে গিয়েছিল । এরপরে আবু বকর (রা.) কখনও প্রতিমার কক্ষে মূর্তিদের কাছে প্রার্থনা করতে যান নি ” ।

তাঁর ইসলাম গ্রহণ:

আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সত্য ধর্মের দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন । প্রকৃতপক্ষে আবু বকর (রা.) হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর প্রতি প্রতিক্রিয়া জানাতে এবং বিশ্বাস করার প্রথম ব্যক্তি ছিলেন । ইসলামের জন্য তাঁর তাৎক্ষণিক গ্রহণযোগ্যতা হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সাথে অবিচল বন্ধুত্বের ফলাফল ছিল । আবু বকর (রা.) নবীকে (সা.) সত্যবাদী, সৎ ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হিসেবে জানতেন যে, যিনি কখনই মানুষের কাছে অবিশ্বস্ত হন নি, তাহলে তিনি কীভাবে আল্লাহর প্রতি অবিশ্বস্ত হবেন ?

আবু বকর (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তখন নবী (সা.) অনেক খুশী হয়েছিলেন । কারণ কুরাইশ গোত্রের সাথে ঘনিষ্ঠতা এবং তাঁর মহান চরিত্রের কারণে আবু বকর (রা.) ইসলামের জন্য বিজয়ের উৎস ছিলেন ।

প্রকৃতপক্ষে আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সর্বদা মূর্তি পূজার বৈধতা নিয়ে সন্দেহই করেছিলেন এবং প্রতিমা উপাসনার প্রতি তাঁর খুব কম উৎসাহ ছিল । সুতরাং যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন তিনি অন্যান্য লোকদের এতে আকৃষ্ট করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন । শীঘ্রই উসমান বিন আফ্ফান (রা.), আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.), তালাহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.), সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.), আল-জুবায়ের বিন আল-আওয়াম (রা.) এবং আবু উবায়দাহ বিন আল-জাররাহ ( রা.) সকলেই মোহাম্মদ (সা.) এর ধর্মে যোগদানের জন্য ভিড় করলেন ।

রাসুল (সা.) একবার বলেছিলেন:

”আবু বকরই একমাত্র ব্যক্তি যে সন্দেহাতীতভাবে অবিলম্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো ।

মুসলমানের সংখ্যা ঊনত্রিশে বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে আবু বকর সিদ্দিক (রা.) জনগণকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাতে নবী (সা.) এর কাছে অনুরোধ জানালেন । এই অনুরোধ অব্যাহত রাখার পরে নবীজী (সা.) তাঁর সম্মতি দিয়েছিলেন এবং তারা সকলেই প্রচারের জন্য মক্কার পবিত্র মসজিদে (কাবা) গিয়েছিলেন । আবু বকর (রা.) একটি খুতবা প্রদান করেছিলেন যা ইসলামের ইতিহাসে প্রথম খুতবা ছিল । কুরাইশদের মধ্যে কাফেররা যখন এটি শুনল তখন তারা আবু বকর (রা.) এবং চারপাশের মুসলমানদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে । আবু বকর (রা.) কে অচেতন হয়ে মৃত্যুর কাছাকাছি না হওয়া পর্যন্ত তাকে তীব্র মারধর করা হয়েছিল । শেষ অবধি যখন তিনি আবার সচেতন হন, তখন তিনি ততক্ষণে জিজ্ঞাসা করলেন: “নবী (সা.) কেমন আছেন ?” তাঁর সমস্ত ব্যথা এবং আহত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর প্রথম চিন্তাটি কেবল নবী (সা.) এর প্রতি ছিল৷। তাঁর প্রতি তাঁর ভালবাসা এতটাই সীমাহীন ছিল যে তিনি নিজেকে নবীর (সা.) এর মঙ্গল ছাড়া কিছুই মনে করেননি ।

তাঁর স্ত্রী কুতায়ালাহ ইসলাম গ্রহণ করেননি তাই তিনি তাকে তালাক দিয়েছিলেন । তাঁর অন্য স্ত্রী উম্মে রুমান মুসলমান হয়েছিলেন । আবুল-রহমান ব্যতীত তাঁর সমস্ত সন্তান ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন ।

তাঁর উপনাম:আস-সিদ্দিক” (সত্যবাদী)

আবু বকর (রা.) এ উপাধিতে সর্বাধিক সুপরিচিত । আস-সিদ্দিক ‘সিদক’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ “সত্যবাদিতা” । সুতরাং আস-সিদ্দিক শব্দের অর্থ এমন এক ব্যক্তি যিনি প্রতিনিয়ত সত্যবাদী বা যিনি অবিচ্ছিন্নভাবে কোনও কিছুর বা কারও সত্যবাদিতার বিশ্বাসী । হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সত্যবাদিতার কারণে আবু বকর (রা.) কে নবী (সা.) ব্যতীত অন্য কেউ এ উপাধি দিয়েছিলেন ।

মদিনায় হিজরত:

Madina, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর জীবনী

নবী (সা.) এবং তাঁর সাহাবীগণ (রা.) যখন কুরাইশদের ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, তখন নবীজি (সা.) তাঁর সাহাবীগণকে মদীনায় হিজরতের আদেশ দিয়েছিলেন । হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (সা.) মুসলমানদের বলেছেন:

“রাসূল (সা.) মুসলমানদের বললেন:

আমাকে তোমাদের হিজরতের স্থান স্বপ্নে দেখানো হয়েছে । সে স্থানে খেজুর বাগান রয়েছে এবং তা দু’টি পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত । এরপর যারা হিজরত করতে চাইলেন, তারা মদীনার দিকে হিজরত করলেন । আর যারা হিজরত করে আবিসিনিয়ায় চলে গিয়েছিলেন, তাদেরও অধিকাংশ সেখান থেকে ফিরে মদীনায় চলে আসলেন । আবু বকর (রা.)ও মদীনায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন । তখন রাসূল (সা.) তাঁকে বললেন, তুমি অপেক্ষা কর । আশা করছি আমাকেও হিজরতের অনুমতি দেয়া হবে । আবু বকর (রা.) বললেন, আমার পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক । আপনিও কি হিজরতের আশা করছেন ? তিনি বললেন, হ্যাঁ । তখন আবু বকর (রা.) রাসূল (সা.) এর সঙ্গ পাওয়ার জন্য নিজেকে হিজরত থেকে বিরত রাখলেন এবং তাঁর নিকট যে দু’টি উট ছিল এ দু’টিকে তাঁদের দীর্ঘ যাত্রায় ব্যবহারের জন্য চার মাস পর্যন্ত বাবলা গাছের পাতা খাওয়াতে থাকলেন ।” (বুখারী: ৩৯০৫)

মক্কার লোকেরা দেখলো যে, হযরত মোহাম্মদ (সা.) আরেক জায়গায় অনুগামী ও সমর্থক পেয়ে গেছেন এবং তারা রাসূল (সা.) এর সাহাবাদের হিজরতের ব্যবস্থা করেছেন । মক্কা থেকে রাসূল (সা.) এর বিদায়ের ভয়ে তারা তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল । তখন ফেরেশতা জিব্রাঈল (আ.) নবী (সা.) কে মক্কা ত্যাগ করার বিষয়ে জানিয়ে দিয়েছিলেন ।

মক্কার সমস্ত উপজাতির একদল তরবারী-সহ নবীজী (সা.) এর ঘর ঘেরাও করছিল, তখন তিনি তাঁর চাচাত ভাই আলি বিন আবী তালিব (রা.) কে তাঁর বিছানায় রেখে বাড়ি থেকে সবার নজর এড়িয়ে বের হয়ে গেলেন এবং হযরত আবু বকর (রা.) কে নিয়ে সকালে খুব তাড়াতাড়ি চলে গেলেন । তাঁদের মক্কা থেকে মদীনার যাত্রা ছিল দুঃসাহসিকতায় পরিপূর্ণ । অবরোধকারী তরোয়ালধারীরা যখনই জানতে পেরেছিল যে, তাঁরা প্রতারণা করে পালিয়ে গেছে । তখন তারা নবীজি (সা.) ও আবু বকর (রা.) এর সন্ধানে লেগে যায় । এবং ঘোষণা করে দেয়- যদি কেউ তাঁদের খুঁজে পেতে পারে তাহলে তাকে একশত উটের একটি পুরস্কার দেওয়া হবে । এ ব্যাপারগুলো ঘটেছিল তাঁরা যখন সাউর নামের একটি গুহায় লুকিয়েছিলেন (যেখানে তাঁরা তিন রাত কাটিয়েছিলেন), একটি মাকড়সা গুহার প্রবেশপথে তার জাল দ্বারা ঘর করেছিল এবং সেখানে একটি কবুতর তার বাসা তৈরি করেছিল ।

তরোয়ালধারীরা তাদের লুকানোর জায়গায় পৌঁছা অবধি তাঁদের পদচিহ্ণ অনুসরণ করে আসছিল, তবে মাকড়সার জাল এবং ভোরের প্রথমভাগ দেখে তারা বাড়িতে চলে গেল এবং সবাইকে জানিয়েছিল যে, এই অন্বেষণও ব্যর্থ হয়েছে ।

আবু বকর (রা.) বলেছেন:

“আমি গুহায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম এবং যখন আমি মাথা উঠালাম তখন আমি লোকদের পা দেখতে পেলাম তখন আমি বলেছিলাম: হে আল্লাহর রাসূল (সা.), তাদের মধ্যে যদি কেউ তার পায়ের নীচে তাকাতে থাকে তবে সে তো আমাদের দেখে ফেলবে ।

“রাসূল (সা.) বলেছিলেন: “হে আবু বকর! তুমি দু’জনকে কী ভাবছো অথচ তৃতীয়জন আল্লাহ আমাদের সাথে  রয়েছেন ।”

ঘটনাটি আল-কুরআনে নিম্নরূপ বর্ণিত হয়েছে:

যদি তোমরা তাঁকে (রাসূলকে) সাহায্য না করো, তবে মনে রেখো, আল্লাহ তাঁর সাহায্য করেছিলেন, যখন তাকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দু’জনের একজন, যখন তারা গুহার মধ্যে ছিলেন । তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন । অতঃপর আল্লাহ তার প্রতি স্বীয় সান্তনা নাযিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখনি । বস্তুতঃ আল্লাহ কাফেরদের মাথা নীচু করে দিলেন আর আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় । (সুরা তাওবা ৯:৪০)

রাসুল (সা.) বলেছেন:

“তোমাদের কেউ প্রকৃত বিশ্বাসী হতে পারে না যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, তার পিতা-মাতা এবং সমস্ত লোকের চেয়ে বেশি প্রিয় হই ।” (ইবনে মাজাহ: ৬৭)

বদর ও উহুদ যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা:

হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর জীবনী

 

১৭ই রমজান, ২ হিজরিতে (১৩ ই মার্চ, ৬২৪ খ্রি.) মদীনার নিকটে অবস্থিত বদর শহরে মুসলমান ও মক্কার অবিশ্বাসীদের মাঝে প্রথম বৃহত্তর যুদ্ধ ছিল বদর ।

আবু বক সিদ্দিক (রা.) নবীজির (সা.) তাঁবুতে অন্যতম রক্ষী ছিলেন এবং তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব উত্তমভাবে গ্রহণ করেছিলেন । ইবনে আসকারের বর্ণনায় আছে যে আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর পুত্র আব্দুর রহমান বদরের দিন কাফেরদের সাথে ছিলেন । তিনি যখন মুসলিম হয়েছিলেন, তখন তিনি তাঁর পিতাকে বললেন:

“আপনি বদরের দিন আমার সামনে এসেছিলেন আমি আপনার কাছ থেকে সরে এসেছি, আপনাকে হত্যা করি নি ।”

আবু বকর (রা.) বলেছেন:

“আমার বক্তব্য হলো, যদি তুমি আমার সামনে পড়তে তবে আমি তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যোতাম না ।”

এই পরিস্থিতি আবু বকর (রা.) এর উচ্চমানের মাহাত্ম্যকে সর্বোপরি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) এর প্রেমকে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সত্যবাদিতা ও আন্তরিকতার গভীরতার প্রমাণ বহন করে ।

আবু বকর (রা.) পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত নির্দেশিকাটি সত্যই প্রয়োগ করেছিলেন ।

মহান আল্লাহ সর্বশক্তিমান কুরআনে বলেছেন:

“যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধাচরণ-কারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভাই অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয় । তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা । তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত । তারা সেখানে চিরকাল থাকবে । আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট । তারাই আল্লাহর দল । জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে । (সুরা মুজাদালাহ ৫৮:২২)

আবু বকর (রা.) কখনও তাঁর অবিশ্বাসী পুত্রকে ভালবাসতেন না, কারণ তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন ।

বদরে কাফেররা যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল, কারণ তীরন্দাজরা উহুদ পর্বতের চূড়ায় তাদের জায়গা ছেড়ে দিয়েছিল । তখন মাত্র এক ডজন লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অবস্থান করেছিলেন, যাদের মধ্যে একজন ছিলেন কট্টর বিশ্বাসী হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ।

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর ব্যয়:

আল্লাহর রাসূল (সা.) একবার আবু বকর (রা.) সম্পর্কে বলেছেন:

“আবু বকর ছাড়া আমার ওপর যার যা অবদান রয়েছে, আমি তা দুনিয়ায় শোধ করে দিয়েছি । তবে আবু বকরের অবদান একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই কিয়ামতের দিন পরিশোধ করবেন । আবু বকরের ধন-সম্পদ থেকে আমি যত উপকৃত হয়েছি, অন্য কারো সম্পদ থেকে এত উপকৃত হইনি ।” (তিরমিজি : ৩৬৬১)

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন:

একদিন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে সদকা করার নির্দেশ দেন । ঘটনাক্রমে সে’দিন আমার কাছে মালা-মালও ছিল । আমি (মনে মনে) বললাম, আজ আমি আবু বকর (রা.) এর অগ্রগামী হবো, যদিও আমি কোনো দিন দানে তার অগ্রগামী হতে পারিনি । তাই আমি আমার অর্ধেক মাল নিয়ে উপস্থিত হলাম । রসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন: পরিবারের জন্য কি অবশিষ্ট রেখে এসেছো ? আমি বললাম, এর সম-পরিমাণ । উমর (রা.) বলেন: আবু বাকর (রা.) তার সমস্ত মাল নিয়ে উপস্থিত হলেন । রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন: পরিবারের জন্য কী অবশিষ্ট রেখে এসেছো ? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে রেখে এসেছি । তখন আমি (উমর) বললাম, আমি কখনো কোনো বিষয়েই আপনাকে অতিক্রম করতে পারবো না । ” (আবু দাউদ: ১৬৭৮)

আবু বকর (রা.) অনেক দাসকে তাদের প্রতি দয়া-মমতা অনুভব করে মুক্তিও দিয়েছিলেন । সূত্র অনুসারে- তিনি আটজন দাস, চারজন পুরুষ এবং চারজন নারীকে কিনে নিয়েছিলেন এবং তাদের স্বাধীনতার জন্য চল্লিশ হাজার দিনার দিয়ে দিয়েছিলেন । আবু বকর (রা.) দাসত্ব থেকে যাদেরকে মুক্ত করেছিলেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর অন্যতম অনুগত ও বিশ্বস্ত সাহাবি হযরত বিলাল বিন রিবা (রা.) ।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমাকে সঙ্গ দিয়ে, ধন-সম্পদ দিয়ে সবচেয়ে বেশি উপকার করেছে আবু বকর । আমি যদি আমার প্রতিপালক মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম, তাহলে আবু বকরকেই গ্রহণ করতাম । তবে তার সঙ্গে রয়েছে আমার ইসলামিক ভাতৃত্ব ও মহব্বতের সম্পর্ক ।” (সহিহ বুখারি: ৩৬৫৪)

নবিজি (সা.) এর ওফাতের (মৃত্যুর) দিন:

১১ হিজরিতে (৬৩২ খ্রি.) নবীজী (সা.) এর ওফাত হলে, অনেক লোক যাদের মধ্যে উমর বিন খাত্তাব (রা.) ছিলেন তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে তিনি মারা গেছেন । তবে যথারীতি অবিচলিত হয়ে গেলেন । আবু বকর (রা.) বিস্মিত জনতাকে সম্বোধন করে তাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে মোহাম্মদ (সা.) আর নেই এবং তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই ।

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী (সা.) মৃত্যুর পর আবু বকর সিদ্দিক (রা.) লোকদের সাথে কথা বলার জন্য বের হয়ে গেলেন । আবু বকর (রা.) ওমর (রা.) কে দু’বার বললেন: “ওমর বসো, শান্ত হও” কিন্তু উমর (রা.) বসতে অস্বীকার করলেন ।

তখন আবু বকর (রা.) বলেলেন:

“তোমাদের যে লোক হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর ইবাদাত করতো সে শুনে রাখুক, তিনি ইন্তেকাল করেছেন । আর যে আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদাত করতো সে জেনে রাখুক, আল্লাহ চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী, তিনি আজও জীবিত রয়েছেন ।”

অতঃপর তিনি কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াত পাঠ করলেন:

“মোহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল ব্যতীত অন্য কিছু নন । তাঁর আগেও অনেক রাসূল গত হয়েছেন । তাই যদি তাঁর মৃত্যু হয় বা হত্যা করা হয়, তবে কি তোমরা পিছনে ফিরে যাবে ? যারা পিছনে ফিরে যায় তারা আল্লাহর কোন ক্ষতিই করতে সক্ষম নয় । শীঘ্রই আল্লাহ কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন ।” (সূরা আল ইমরান ৩:১৪৪)

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন:

“আল্লাহর কসম, লোকেরা যেন কখনই জানত না যে আল্লাহ এই আয়াতটি নাযিল করেছেন যতক্ষণ না আবু বকর (রা.) তা পাঠ করেছিলেন এবং সমস্ত লোক তাঁর কাছ থেকে গ্রহণ করেছিল আর আমি প্রত্যেককেই এটি পড়তে শুনেছি ।”

উমর বিন খাত্তাব (রা.) বলেছেন:

“আমার পা আমাকে সমর্থন করতে পারেনি, নবী করীম (সা.) মারা গেছেন তা ঘোষণা করে আমি আয়াতের আবৃত্তি শোনার সাথে সাথেই ঢলে পড়ে গেলাম ।”

(বুখারী: ৪৪৫২, ৪৪৫৩)

পবিত্র কুরআনের সংকলন:

আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ইসলামকে সবচেয়ে বড় যে সাফল্য উপহার দিয়েছিলেন তা হল পবিত্র কুরআনের সংকলন । সে সময় শত শত স্মরণার্থী ছিলেন যারা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবনকালে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে পুরো কুরআন মুখস্থ করেছিলেন, তবে পবিত্র কুরআন কখনও গ্রন্থ আকার মেনে চলেনি । যদিও রাসূল (সা.) এর  মৃত্যুর পরেও এর মুখস্থকরণ অব্যাহত ছিল । তবে নবীজির (সা.) বিদায় নেয়ার পর বিভিন্ন যুদ্ধে এই মুখস্থকারীদের বেশ কয়েকজন শহীদ হয়েছিলেন । ফলস্বরূপ উমর (রা.) এর চিন্তায় আসে যে, কুরআনকে যে কোনও ধরণের ঝুঁকিতে না রেখে মূল রূপে অক্ষত রাখার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া উচিত । তিনি দেখেছিলেন, যারা এর স্মৃতি হৃদয়ে প্রতিপালন করেছেন তাঁদের উপরেই নির্ভর করা বুদ্ধিমানের কাজ নয় । তাই তিনি আবু বকর (রা.) কে একটি গ্রন্থ আকারে তা লিখে রাখার জন্য অনুরোধ করেছিলেন । আবু বকর (রা.) প্রথমে দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলেন, কারণ এ কাজটি নবী (সা.) নিজে করেননি । এই বিষয়ে কিছু বিতর্ক করার পরে অবশেষে তিনি সম্মত হন এবং এই কাজের জন্য যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)কে নিয়োগ করেন । যায়েদ (রা.) এইরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার চিন্তাভাবনায় দ্বিধায় পড়েছিলেন, তবে পরে তিনি মনোনিবেশ করেছিলেন এবং কাজটি শুরু করেছিলেন । যায়েদ (রা.) সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন কারণ তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামের কাছ থেকে সরাসরি কুরআন শিখেছিলেন বলে আলেম হিসেবে কাজ করেছিলেন ।

যায়েদ (রা.) ক্লান্তিকর কাজটি সম্পাদন করে এবং কুরআনকে একটি গ্রন্থাকারে সংগঠিত করে তিনি আবু বকর (রা.)কে মূল্যবান সংগ্রহটি জমা দিয়েছিলেন । তিনি এটিকে তাঁর জীবনের শেষ অবধি রেখেছিলেন । উমর (রা.) এর খেলাফতের সময় তা উমরের কন্যা হাফসাহ (রা.) এর হেফাজতে রাখা হয়েছিল । অবশেষে উসমানের (রা.) দিনগুলিতে যখন বিভিন্ন পাঠকগণ এটি আলাদাভাবে তেলাওয়াত করতে শুরু করেন, তখন খলিফার এ সংগ্রহটির কয়েকটি কপি তৈরি হয়েছিল এবং সেগুলো ইসলামী বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন দেশে বিতরণ করা হয়েছিল । কুরআনের আধুনিক সংস্করণ হল উসমান অনুলিপি, যা অন্য প্রতিটি অনুলিপি অনুসারে সাজানো হয়েছিল ।

যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বলেছেন:

“আল্লাহর কসম, আবু বকর (রা.) কুরআন সংগ্রহের বিষয়ে আমাকে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তার চেয়ে পর্বতমালার একটিকে তার জায়গা থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলে আমার পক্ষে এত কঠিন হত না ।”

তবু তিনি অবিরত ছিলেন, তিনি বলেন:

“আমি কুরআনী উপাদানগুলো সনাক্ত করতে এবং এটি চামড়া, স্ক্যাপুলা, খেজুরের ডালপালার মাধ্যমে পুরুষদের স্মৃতি থেকে সংগ্রহ করতে শুরু করি ।”

আলী ইবনে আবী তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

“জনগণের মধ্যে যার সর্বাধিক পুরষ্কার রয়েছে সে হলেন আবু বকর (রা.), কারণ তিনি কুরআন সংকলনে অনন্য ছিলেন ।”

তাঁর মৃত্যু ও সমাধিস্থল:

আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সোমবার ২২ শে জুমাদাল-আখিরাহ ১৩ হিজরী (২৩ আগস্ট, ৬৩৪ খ্রি.) ১৫ দিনের জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পরে ৬১ বছর বয়সে পরলোক গমন করেছিলেন আর তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন উমর বিন খাত্তাব (রা.) যেন নামাজের নেতৃত্ব দেন । একটি গল্প আছে যাতে তাঁর খাবারে ইহুদিদের বিষ মিশানোর অভিযোগ এনেছে, তবে এর সত্যতা নেই । আবু বকর (রা.) যখন মারা যান, তখন তাঁর বয়স হয়েছিল তেত্রিশ (৩৩) বছর এবং তাঁর খেলাফতকাল ছিল মাত্র দুই বছর তিন মাস  (৬৩২ – ৬৩৪ খ্রি.) । অসুস্থতার সময় তিনি ইসলাম এবং এর ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতার কথা ভাবছিলেন । রাসূল (সা.) এর অনেক সুপরিচিত সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করার পর উমর বিন খাত্তাব (রা.)কে খিলাফত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ।

অতঃপর তিনি উমর (রা.)কে ডেকে এই দায়িত্ব দিয়ে তাঁর লোকদের কীভাবে নেতৃত্ব দিবেন সে সম্পর্কে পরামর্শ দিয়েছিলেন:

“আপনি যদি আমার পরামর্শ মেনে চলেন তবে অজানা কিছুই আপনার কাছে মৃত্যুর চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য হবে না; তবে আপনি যদি তা প্রত্যাখ্যান করেন তবে অজানা কিছুই মৃত্যুর চেয়ে ভয়ঙ্কর আর হতে পারে না ।”

মৃত্যুর পূর্বে আবু বকর (রা.) তাঁর খেলাফতের সময় জনসাধারণের কোষাগার থেকে নিয়ে যাওয়া সমস্ত কিছু ফিরিয়ে দিয়েছিলেন । কথিত আছে যে, তিনি উত্তরাধিকারদের মোটেই কোনও টাকা দান করেননি । তিনি কেবল একটি চাকর, একটি উট এবং একটি পোশাক রেখেছিলেন । তাঁর আদেশ ছিল তাঁর মৃত্যুর পরে পোশাকটি যেন তাঁর উত্তরসূরীর হাতে পৌঁছে দেওয়া হয় । এটি দেখে উমর (রা.) কাঁদলেন এবং বললেন:

“আবু বকর (রা.) তাঁর উত্তরসূরির বিষয়টি খুব কঠিন করে তুলেছেন ।”

আবু বকর (রা.) তাঁর কন্যা ও হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর স্ত্রী আয়েশা (রা.)কে সুপারিশ করেছিলেন, তাঁকে যেন নবী (সা.) এর ঠিক কবরের পাশে আয়েশার ঘরে সমাধিস্থ করা হয় । যখন তিনি মারা যান তাঁর জানাযার নামায উমর (রা.) এর নেতৃত্বে হয় এবং তাঁর কবর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটবর্তী করা হয় । তাঁর কবরটি এমনভাবে খনন করা হয়েছিল যে তাঁর মাথাটি রাসূলের (সা.) কাঁধের সমান্তরালে ছিল ।

আবু বকর (রা.) এর মৃত্যুর দুঃখজনক সংবাদটি শুনে আলী বিন আবি তালিব (রা.) ছুটে গেলেন তাঁর বাড়িতে । তিনি একটি সুদীর্ঘ বক্তব্য রেখেছিলেন যা তিনি আবু বকর (রা.)কে সম্বোধন করেছিলেন । আবু বকর (রা) এর মৃত্যুর দিন আলী (রা.) কিছু কথা এমন বলেছিলেন:

“হে আবু বকর (রা.), আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটতম সহচর এবং বন্ধু ছিলেন । আপনি তাঁর প্রতি সান্ত্বনা পেয়েছিলেন; আপনিই তাঁর উপর সবচেয়ে বেশি ভরসা করেছিলেন । যদি তাঁর কোন গোপন কথা থাকে, তবে তিনি আপনাকে তা জানাতেন । এবং যদি আপনার কোন বিষয়ে কারও সাথে পরামর্শ করার দরকার হয়, তবে তিনি আপনাকে পরামর্শ দিতেন । আপনি ইসলাম গ্রহণ করার জন্য আপনার লোকদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি ছিলেন এবং আপনি তাদের বিশ্বাসে আন্তরিক ছিলেন । অন্য কোন ব্যক্তির চেয়ে আপনার ঈমান সুদৃঢ় ছিল । আল্লাহকে ভয় করা এবং আল্লাহর দ্বীন থেকে যা অর্জন করেছেন সে অনুসারে আপনি অন্য সবার চেয়ে ধনী হয়েছেন । আপনি আল্লাহর রাসূল (সা.) ও ইসলাম উভয়েরই সর্বাধিক যত্নবান ছিলেন । সকল লোকের মধ্যেই আপনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ সাহাবী । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আপনি সেরা গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন, আপনার সেরা অতীত ছিল, আপনি সর্বোচ্চ স্থান অর্জন করেছিলেন এবং আপনি তাঁর অধিক নিকটবর্তী ছিলেন । আর সমস্ত লোকের মধ্যেই আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর হেদায়েতের ক্ষেত্রে সর্বাধিক সাদৃশ্য-যুক্ত করেছেন ।

লোকেরা আলী (রা.) এর চারপাশে জড়ো হয়েছিল এবং তাঁর বক্তব্য শেষ না হওয়া অবধি মনোযোগ দিয়ে শুনছিল । তারপর তারা সকলেই উচ্চস্বরে আলী (রা.) এর বক্তৃতার সাথে এক হয়ে সাড়া দিয়ে বলল “সত্যিই আপনি সত্য বলেছেন ।”

ইসলামের পক্ষে আজীবন সংগ্রামের পর আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর শান্তিপূর্ণ মৃত্যু হয়েছিল । ইসলামের প্রথম দিকের পুরো বছরগুলিতে আবু বকর (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষে সর্বদা স্বাচ্ছন্দ্য এবং অবিরাম সাহায্যের উৎস ছিলেন । তিনি সর্বদা ইসলামের পক্ষে তার সম্পদ এবং তাঁর জীবন ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলেন ।

অতঃপর যখন নবী (সা.) পরলোক গমন করলেন, আবু বকর (রা.) নবী (সা.) এর পরে প্রথমে মুরতাদদের বিরুদ্ধে লড়াই করে পরাজিত করেন এবং তাঁর খেলাফতকালে ঘটে যাওয়া কয়েকটি বড় বড় বিজয়ে ইসলাম প্রচারের মাধ্যমে মুসলিম জাতির ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করেছিলেন ।

আল্লাহ তা’য়ালা আবু বকর (রা.) এর উপর সন্তুষ্ট থাকুন এবং তাকে সর্বোত্তম পুরষ্কার দান করুন । আমিন …